রাজনৈতিক অস্থিরতায় তিন মাসে ক্ষতি ১৭ হাজার কোটি টাকা
ঢাকা: চলতি অর্থবছরের (২০১৫) শুরু থেকে প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় উৎপাদনখাতে প্রায় ১৭ হাজার ১৫০ কোটি টাকা (২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার) ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, বছরের শুরু থেকে টানা রাজনৈতিক অস্থিরতায় চলতি অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০১৫ সালের শুরুতেই যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকত, তাহলে চলতি (২০১৪-১৫) অর্থবছরে ৬ দশমিক ৪ থেকে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হত।
রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এসব তথ্য জানান।
তিনি জানান, “বাংলাদেশে গত ৩ মাসে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থাৎ ১৭ হাজার ১৫০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। এটি মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশ।”
বিশ্বব্যাংক জানায়, রাজনৈতিক অস্থিরতায় এ বছর বাংলাদেশে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় পৌনে ২ লাখ কোটি টাকা। এ কারণে অর্থবছর শেষে দেশের প্রবৃদ্ধির হার কমে দাঁড়াবে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। বিশ্ব ব্যাংকের মতে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ। আর এ সূচক কমার অন্যতম কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতাকে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগামী ২০১৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে সময় প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়াবে ৬ দশমিক ৩ শতাংশে। এ ছাড়া ২০১৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। কিন্তু এ জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। সেই সঙ্গে অবকাঠামো খাতে সংস্কার, অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) উন্নয়নসহ বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে বেশি জোর দিতে হবে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইউহানেস জাট, প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন, প্রাকটিস ম্যানেজার শুভ চৌধুরী ও যোগাযোগ কর্মকর্তা মেহেরীন এ মাহবুব।
অন্যদিকে গত ৫ এপ্রিল মহাখালী ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ ‘কেমন হবে নতুন ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট শীর্ষক’ অনুষ্ঠানে মূল গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে সিপিডির রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, “৫ জানুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত ৮১ দিনের টানা অবরোধ ও ৬৭টি দিনের হরতালে দেশের অর্থনীতির মোট ক্ষতি হয়েছে ৪ হাজার নয়শ কোটি টাকা, যা ২০১৪-১৪ অর্থবছরের মোট জিডিপির প্রবৃদ্ধির শুন্য দশমিক ৫৫ শতাংশ। এর ফলে জিডিপির কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব হবে না। এ সময়ে ১ হাজার ২১১টি গাড়ি ক্ষতি গ্রস্ত হয়েছে এবং ১০০ জনের প্রাণহানি হয়েছে।”
এসময় সংস্থার নির্বাহি পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান, অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের অর্থনৈতিক বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। কেননা দ্রুত ও টেকসই প্রবৃদ্ধির প্রাথমিক শর্তই হচ্ছে এটি। অন্যান্য চ্যালেঞ্জগুলো হলো- মুদ্রা বিনিময় হার আর্থিক খাতের জবাবদিহিতা ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি। বিশেষ করে স্পেশাল ইকনোমিক জোনে বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতের মনিটরিং, ক্রয় পরিবেশ, তৈরি শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য জমির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, পরিবহন সমস্যা খুঁজে বের করে তার সমাধান এবং যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাজে নারীদের অংশ গ্রহণের প্রতিবন্ধকতা দূর করা।
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইউহানেস জাট বলেন, “মিলেনিয়াম ডেভলপমেন্ট গোল (এমডিজি) লক্ষ্য পূরণে ভাল করেছে বাংলাদেশ। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশ সোচ্চার ভূমিকা রাখছে।"
তিনি বলেন, ‘নতুন ব্রিকস ব্যাংক এবং এআইবি ব্যাংকে বাংলাদেশ যোগ দিয়েছে। আমরা একে স্বাগত জানাই। কেননা প্রতিবছর অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা বিশ্বব্যাংক বা বর্তমান অন্যান্য সংস্থাগুলো সহায়তার মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে নতুন ব্যাংক দুটো এ গ্যাপ পূরণ করবে। পাশাপাশি দারিদ্র বিমোচনে ভূমিকা রাখবে।’
বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ৬ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ধরে রাখা যাবে। তবে বর্তমানে খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে কিছুটা অস্থিতিশীলতা দেখা গেলেও তা এখনও সহনীয় আছে। ঘাটতি অর্থায়নের কোনো সমস্যা হয়নি। রিজার্ভে হাত দিতে হয়নি। কাজেই বলা যায়, বহির্বাণিজ্যে কিছুটা স্বস্তি আছে। তবে রপ্তানির ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা আছে, এদিকে নজর দিতে হবে।”
জাহিদ হোসেন বলেন, “প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে অবশ্যই নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। যেটি বর্তমানে ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ আছে সেটি ৪৮ শতাংশে আগামী ১০ বছরে নিয়ে যেতে পারলে প্রতিবছর জিডিপিতে যোগ হবে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।”
নিউজবাংলাদেশ.কম/জেএস/এএইচকে
নিউজবাংলাদেশ.কম








