News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১১:৪৬, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

তীব্র জ্বালানি সংকটের চাপে শিল্প উৎপাদন কমেছে ৩০%

তীব্র জ্বালানি সংকটের চাপে শিল্প উৎপাদন কমেছে ৩০%

ছবি: নিউজবাংলাদেশ

বিশ্বজুড়ে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপে বাংলাদেশের শিল্প খাতে গভীর সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন হামলায় আক্রান্ত ইরান পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয়ায় এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি ও কাঁচামাল পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে এবং পোলট্রি খাতে উৎপাদন খরচ গত পাঁচ বছরে প্রায় ৯০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। 

এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে উৎপাদন খরচ কমাতে করব্যবস্থা সহজীকরণ এবং বিশেষ নীতিগত সহায়তার দাবি জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ শিল্প উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা। আলোচনায় উঠে এসেছে, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সরবরাহ সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতে, যার ফলে উৎপাদন সক্ষমতা ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক চাপ তৈরি হচ্ছে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে লোডশেডিং মোকাবিলায় জেনারেটর চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ও পণ্য পরিবহন ও শিপমেন্ট কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তৈরি পোশাক খাতে গড়ে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। একইসঙ্গে পোলট্রি খাতে গত পাঁচ বছরে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৯০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও বেড়েছে।

ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, আসন্ন বাজেটে উৎপাদন খরচ কমাতে করব্যবস্থা সহজীকরণ, নীতিগত সহায়তা এবং স্বল্প সুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা জরুরি। 

তাদের মতে, উচ্চ সুদহার, স্বল্পমেয়াদি ঋণ কাঠামো এবং জ্বালানি অনিশ্চয়তা মিলিয়ে শিল্প খাত টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, দেশে মূলধনী বিনিয়োগের ঋণের মেয়াদ মাত্র ৫-৬ বছর, যেখানে প্রতিযোগী দেশে তা ১২-১৫ বছর পর্যন্ত। তিনি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এসএমই খাতে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজের সুপারিশ করেন।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ক্রেতাদের আস্থা ফিরলেও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। 

তার মতে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে। তিনি আরও জানান, গাজীপুর ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে লোডশেডিং এবং ডিজেল সংকটের কারণে উৎপাদন ও শিপমেন্ট বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, পাশাপাশি কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে।

আরও পড়ুন: জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত পোশাক খাত, উৎপাদন কমেছে ৩০ শতাংশ

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলমান সংঘাত ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল উত্তেজনার প্রভাব বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস ৩.৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩.১ শতাংশ করেছে। একইসঙ্গে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি চলতি বছরে ৪.৪ শতাংশে পৌঁছে আগামী বছরে ৩.৭ শতাংশে নামতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় এশিয়া ও ইউরোপে জ্বালানি পরিবহন সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে কাঁচামাল ও পরিবহন খরচে।

এদিকে পোলট্রি খাতেও সংকট গভীর হয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, খাদ্যের দাম বৃদ্ধি ও উচ্চ করের বোঝায় এ শিল্প ‘ধ্বংসের মুখে’ পড়েছে। বর্তমানে একটি ডিমের উৎপাদন খরচ সাড়ে ১০ থেকে ১১ টাকা হলেও পাইকারি বাজারে দাম প্রায় সমান পর্যায়ে রয়েছে। একইভাবে ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ১৪৬ টাকা হলেও বাজারদর ১৮০ থেকে ১৯০ টাকার মধ্যে থাকায় অনেক খামার লোকসানে পড়ছে এবং বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্টরা করপোরেট কর ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা, টার্নওভার ট্যাক্স হ্রাস এবং ফিড আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে টেক্সটাইল ও রপ্তানিমুখী শিল্পেও একই ধরনের চাপ দেখা দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলা ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সুতার দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এতে অনেক কারখানা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠান আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে। ফলে হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ওপর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

শিল্প মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, টানবাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে প্রতি পাউন্ড সুতার দাম ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক কারখানায় মেশিন সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে এবং উৎপাদন এক শিফটে সীমিত করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে জেনারেটর ব্যবহার করতে গিয়ে ডিজেল সংকটও নতুন চাপ তৈরি করেছে। অতিরিক্ত দামে জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

শিল্পাঞ্চল রূপগঞ্জের বিভিন্ন কারখানা মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুতার দাম বৃদ্ধির ফলে মাসিক ব্যয় কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিক ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে চাহিদা ও দামের ভারসাম্য না থাকায় তারা ধারাবাহিকভাবে লোকসানের মুখে পড়ছেন এবং অনেক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তারা আরও জানান, ডলারের অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সংকট মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। কাপড়ের দাম কিছুটা বাড়লেও ক্রেতারা সেই দামে পণ্য কিনতে আগ্রহী নন, ফলে বাজারে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। শ্রমিকরাও উৎপাদন কমে যাওয়ায় আয় হ্রাসের মুখে পড়েছেন।

এদিকে শিল্প খাত টিকিয়ে রাখতে ও নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ব্যবসায়ী নেতারা আসন্ন বাজেটে বাস্তবসম্মত নীতি সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছেন, অর্থায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কর কাঠামো সংস্কার ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্প খাতকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব নয়। রূপগঞ্জের ইউএনও সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং খাতটির স্থিতিশীলতা রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়