জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত পোশাক খাত, উৎপাদন কমেছে ৩০ শতাংশ
ছবি: সংগৃহীত
তীব্র জ্বালানি সংকট ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্প এক নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতির কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে জানিয়েছেন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর নেতারা। বিশেষ করে গাজীপুর ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে এই সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে, যার ফলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ (শিপমেন্ট) করা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ পরিস্থিতি তুলে ধরেন বিজিএমইএ নেতারা। বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত উপস্থিত ছিলেন। বিজিএমইএ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন সংগঠনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। এছাড়া প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান, সহসভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান এবং জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বিজিএমইএ নেতারা জানান, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর চালানোর জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণও সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ায় সামগ্রিক উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি প্রকট আকার ধারণ করেছে গাজীপুর ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে।
বৈঠকে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ক্রেতাদের আস্থা কিছুটা ফিরে এলেও আন্তর্জাতিক বাজার নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব বাংলাদেশি পোশাক শিল্পকে নাজুক অবস্থায় ফেলেছে।
তিনি আরও জানান, চাহিদামতো জ্বালানি না পাওয়ায় বর্তমানে অনেক কারখানার সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে, যা রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আরও পড়ুন: ইইউ ও নতুন বাজারে পোশাক রফতানিতে বড় ধরনের ধাক্কা
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত আট মাস ধরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমতির দিকে রয়েছে এবং নিকট ভবিষ্যতে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনাও অনিশ্চিত। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা দুর্বল হওয়ায় সংকট আরও গভীর হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উদ্যোক্তারা সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কারখানার নিকটবর্তী ফিলিং স্টেশন থেকে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার অনুরোধ জানান। পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি শিল্পকারখানায় দ্রুত গ্যাস সংযোগ প্রদান এবং শিল্পাঞ্চলভিত্তিক সমান বণ্টনের ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা। এ বিষয়ে জরুরি ব্যবস্থায় ডিজেল সরবরাহের জন্য বিজিএমইএর প্রদত্ত ফরম্যাট অনুমোদন করা হয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
এছাড়া অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জ্বালানি ব্যবস্থার আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে অতিরিক্ত ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপন এবং শিল্প খাতে ইলেকট্রনিক ভলিউম কারেক্টর (ইভিসি) মিটার স্থাপন প্রক্রিয়া সহজ করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়। আমদানি করা জ্বালানির ওপর আরোপিত সব ধরনের আমদানি ও ভোক্তা পর্যায়ের কর ও ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানান উদ্যোক্তারা।
পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের লক্ষ্যে সোলার পিভি সিস্টেমের সরঞ্জাম আমদানিতে বিশেষ শুল্ক সুবিধা এবং সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ডিসি কেবলসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ওপর বিদ্যমান উচ্চ শুল্ক ২৮.৭৩ শতাংশ থেকে ৬১.৮০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাবও উত্থাপন করা হয়।
বৈঠকে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী উদ্যোক্তাদের বক্তব্য গুরুত্বসহকারে শোনেন এবং দেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা বিবেচনা করে সংকট সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তারা দ্রুত ও কার্যকরভাবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত করতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








