‘টাকাসহ জামায়াত নেতা আটকের ঘটনা অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রমাণ’
ছবি: সংগৃহীত
ভোটের আগের দিন সৈয়দপুর বিমানবন্দরে অর্ধকোটির বেশি টাকাসহ জামায়াতে ইসলামীর এক নেতাকে আটকের ঘটনা দলটির দেউলিয়াত্ব, অনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ করে বলে মনে করছে বিএনপি।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বিকালে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন এ অভিযোগ করেন।
মাহদী আমিন বলেন, টানা চারদিন যেখানে দেশের সব ব্যাবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ, সেখানে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ কোন ব্যাবসায়িক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হতে পারে, সেটি বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। স্পষ্টতই, আচরণবিধির এই লঙ্ঘন গণবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক দলটির দেউলিয়াত্ব ও অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাকে প্রমাণ করে। যারা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বয়ান তৈরি করে, তাদের কাছে প্রশ্ন করা যেতেই পারে, টাকা দিয়ে ভোট কেনা তাদের সেই দুর্নীতিবিরোধী বয়ানের সাথে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ?
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র বলেন, বিএনপির অনিবার্য বিজয়ের বিপরীতে একটি গোষ্ঠী নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে। আমরা আজ সকালে গণমাধ্যমে দেখতে পেলাম, সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ঢাকা থেকে যাওয়ার পর, নগদ অর্ধকোটিরও বেশি টাকাসহ ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমিরকে আটক করেছে পুলিশ। যেখানে নির্বাচনে অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেন প্রতিহত করতে সব ব্যাংক, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক লেনদেন ও কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই সর্বত্র প্রশ্ন উঠেছে- জামায়াতের একটি জেলার সর্বোচ্চ নেতা কোন উৎস থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে কী উদ্দেশ্যে কাদের দেওয়ার জন্য নির্বাচনের আগের দিন ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওয়ে যাচ্ছেন?
আরও পড়ুন: অর্ধকোটি টাকাসহ আটক জেলা জামায়াতের আমির হাসপাতালে ভর্তি
তিনি আরও বলেন, সৈয়দপুর বিমানবন্দরের কাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, দেশের অন্যান্য জায়গার মতো জামায়াতের আমিরের নির্বাচনী আসন ঢাকা-১৫তেও একই রকম অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেনের ঘটনা সংঘটিত হতে দেখা গেছে। কুমিল্লা, নোয়াখালী, খুলনাসহ দেশের অসংখ্য জায়গাতেও দেখা গেছে। ইতোপূর্বে দেশব্যাপী দলটির নেতাকর্মীরা বাসায় বাসায় গিয়ে ভোটারদের বিকাশ নম্বর ও ভোটার আইডি নম্বরও নিয়েছে। তবে বিকাশ, রকেট বা নগদের মাধ্যমে এভাবে অবৈধ অর্থ প্রেরণ বা জান্নাতের টিকিটের প্রলোভনকে ধর্মপ্রাণ দেশবাসী ইতোমধ্যেই প্রত্যাখ্যান করেছেন।
মাহদী আমিন বলেন, গণমাধ্যমের সংবাদে আমরা দেখছি দেশের অনেক জায়গায় ভোটারদের মাঝে ভীতি ছড়াতে একটি রাজনৈতিক দলের সন্ত্রাসীরা দেশীয় অস্ত্রসহ বাঁশ, পাইপ ও স্ট্যাম্প জড়ো করছে। বিভিন্ন জেলায় সহিংসতা, অতর্কিত হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অর্থ বিতরণ করছে। এসব ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত, ভোটের মাঠে নানা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিসহ অনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত সেই দলের অনেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আরও বলেন, আমরা উদাহরণস্বরূপ কেবল একটি মর্মান্তিক ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। বগুড়া-৪ আসনে নন্দীগ্রামে জামায়াতের চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের হামলায় থালতা-মাঝগ্রাম ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মাসুদ রানার চোখ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার চোখের দৃষ্টি হারানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে তার মা স্ট্রোক করে মারা যান। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও দ্রুত বিচারের দাবি জানাই।
মাহদী আমিন বলেন, আমরা অতি দ্রুত দেশব্যাপী নির্বাচন কমিশন তথা রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে প্রতিটি ঘটনা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, আমরা উৎসাহের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, মুষ্টিমেয় কিছু সন্ত্রাসীর এই অরাজকতা রুখে দিয়ে, গণতন্ত্রকামী মানুষ প্রবল উৎসাহ নিয়ে ভোট প্রদানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অনেক জায়গায় টাকা দিয়ে ভোট কিনতে গিয়ে এই দুর্বৃত্তরা জনতার প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে।
মাহদী আমিন বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রচুর বোরখা ও নিকাব বানানোর বিষয়ে আমরা জানতে পেরেছি এবং ইসলামী মূল্যবোধের ধারক দল হিসেবে বিএনপি সবসময় বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে বোরখা ও নিকাব ধর্মীয় সংস্কৃতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা অবশ্যই নারীদের আব্রু ও পর্দার ব্যাপারে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাশীল, কিন্তু ইসলামি সেই পোশাককে অপব্যবহার করে কেউ যদি মিথ্যা পরিচয়ে জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে সেটিকে প্রতিরোধ করতে হবে। সন্দেহজনক ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত করতে এনআইডি কার্ড, হজ, ওমরাহ, পাসপোর্ট বা ভিসার জন্য ছবি তোলার মতো করেই মুখমণ্ডলের যে অংশটুকু অনাবৃত রেখে ছবি তুলতে হয়, ভোটার তালিকা অনুযায়ী নারী প্রিসাইডিং বা সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও নারী চ্যালেঞ্জকারী বা এজেন্টের উপস্থিতিতে ভোট প্রদানের আগে ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে।
মাহদী আমিন বলেন, এর আগেও আমরা দেখেছি, লক্ষ্মীপুরে ভোটে ব্যবহারের অবৈধ সিল উদ্ধারের ঘটনায় একটি প্রিন্টিং প্রেসের মালিক গ্রেপ্তার হয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, ওই দলের একজন নেতার নির্দেশেই এসব সিল তৈরি করা হয়েছে। এমনকি তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে পাওয়া অর্ডারের তথ্য, জব্দকৃত আলামত ও সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার প্রমাণও প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া গেছে, যা নির্বাচনকে প্রভাবিত করার একটি ষড়যন্ত্রের প্রমাণ।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শকে ধারণ করে এবং দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার দল হিসেবে বিএনপি গণমানুষের ভালোবাসা, আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে এ দেশের মাটিতে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্রত রয়েছে। আগামীকালের যে নির্বাচন, সেটিতে ইনশাআল্লাহ এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, যেটি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ, যেটি স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে থাকবে, জনগণের পাশে থাকবে। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ে ধরে লুণ্ঠিত ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের এই ঐতিহাসিক সময়ে আমরা প্রতিটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলকে অনুরোধ করব সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে জনগণের মতামতের ওপর আস্থা রাখতে, শ্রদ্ধা জানাতে।
মাহদী আমিন বলেন, এই নির্বাচনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মীমাংসিত হওয়ার আছে। বাংলাদেশের নারীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, পরিবার ও সমাজে কতটা সম্মান এবং মর্যাদার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হবেন? কর্মঘণ্টা সীমিত করার মধ্য দিয়ে, মনোনয়ন বঞ্চিত করে, উপর্যুপরি নারীদের অমযার্দাকর ও অশালীন সম্বোধন করে, নারী সমাজে যে অবমাননার চিত্র একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করছে, এই নির্বাচন সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ জানানোর একটি অপূর্ব সুযোগ। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সমাজে নারীদের এই অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
মাহদী আমিন বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের প্রতি আমরা আহ্বান জানাই, আসুন, সহিংসতা নয়, সবাই শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করি। বজায় রাখি পারস্পরিক সহাবস্থান ও সৌহার্দ্য। সব ধরনের কারচুপি বা জালিয়াতি রুখে দিয়ে নির্বাচনের যে উৎসবমুখর, স্বতঃস্ফূর্ত পরিবেশ আজকের গণআকাঙ্ক্ষা, সেটিকে বাস্তবায়ন করা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব। তিনি বলেন, এই নির্বাচন কেবল ভোটের অধিকার নয়; এই নির্বাচন দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার এবং স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার লড়াই। এই নির্বাচন শহীদ এবং গুম হওয়া প্রতিটি সন্তানের মায়ের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংকল্প। এই নির্বাচন দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীক।
মাহদী আমিন বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, নেতিবাচক রাজনীতি নয়, ইতিবাচক, জনসম্পৃক্ত ও গণমুখী রাজনীতির ভিত্তি হতে পারে যে নির্বাচন, আগামীকাল, তার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মালিকানা জনগণের কাছে ফেরত আসবে, ইনশাআল্লাহ। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিককে আহ্বান জানাই, আপনারা কাল সকালে যত দ্রুত সম্ভব ভোটকেন্দ্রে আসুন। এই নির্বাচনে বিজয় হোক বাংলাদেশের, এই নির্বাচনে বিজয় হোক বাংলাদেশের মানুষের।
তিনি বলেন, নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সদস্য ও গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রতি বিনীত আহ্বান জানাই, আপনারা দেশ ও দেশের মানুষের জন্য, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে থাকুন। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই নিশ্চিত করবে জনগণের ঐক্য, প্রতিষ্ঠা করবে জনগণের রাষ্ট্রীয় মালিকানা। তিনি আরও বলেন, দেশব্যাপী বিএনপির অপ্রতিরোধ্য জনপ্রিয়তার জোয়ারে আমরা সবাই শামিল হই। গণতন্ত্র রক্ষার প্রমাণিত শক্তি বিএনপির এই অবশ্যম্ভাবী বিজয়ের মিছিলে আপনাকে স্বাগতম।
মাহদী আমিন বলেন, আগামীকাল যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, এটি বাংলাদেশ নামক দেশটির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও রক্ষা করার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে রাজপথে নেতৃত্ব দেওয়া বিএনপির বিজয় অনিবার্য, ইনশাআল্লাহ। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমেও সেই চিত্র ফুটে উঠেছে। মাঠের বাস্তবতা, জনস্রোত, গ্রহণযোগ্য জরিপ তথা গণমানুষের প্রত্যাশায় আজ এটিই প্রতিফলিত। বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমান ভাই-বোনেরাসহ, দেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, সমতল ও পাহাড়ের সব বর্ণ, বিশ্বাস ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষ ইতোমধ্যে বিএনপিকে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দিয়েছেন। জনসাধারণের মাঝে বিএনপি জনপ্রিয়তা বরাবরের মতোই শীর্ষে অবস্থান করছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/এনডি








