আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১১:৩২, ২৮ মে ২০২৬

হরমুজ প্রণালিতে ফের মার্কিন হামলা, পাল্টা জবাব ইরানের

হরমুজ প্রণালিতে ফের মার্কিন হামলা, পাল্টা জবাব ইরানের

ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি ও ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় এলাকায় নতুন করে সামরিক উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। তিন মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য যখন দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই ইরানের অভ্যন্তরে একের পর এক মার্কিন হামলা এবং এর জবাবে ইরানের পাল্টা আঘাতের ঘটনায় পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন চরম ঝুঁকির মুখে। 

ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যেই গত তিন দিনের ব্যবধানে ইরানের ওপর দ্বিতীয় দফা বড় ধরনের এই সামরিক অভিযান চালাল যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন হামলার পরপরই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে মার্কিন ‘আগ্রাসনের উৎস’ হিসেবে চিহ্নিত একটি বিমানঘাঁটিতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে একটি মার্কিন তেলবাহী জাহাজকে পিছু হটতে বাধ্য করার দাবি করেছে তেহরান। দুই বৈরী দেশের এই নতুন সামরিক সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি হুমকির মুখে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি, রয়টার্স ও আল জাজিরার প্রতিবেদনে জানা গেছে, স্থানীয় সময় বুধবার (২৭ মে) এবং বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ভোরে ইরানের কৌশলগত বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় মার্কিন সামরিক বাহিনী। 

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত করে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল বন্দর আব্বাসের একটি স্থল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, যেখান থেকে মার্কিন বাহিনী ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের ওপর হামলার জন্য পঞ্চম ড্রোনটি উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। এর পাশাপাশি মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালির আশপাশে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করা আরও চারটি ইরানি ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করেছে। 

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, মাইন পেতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা এবং মার্কিন সেনাদের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে ওঠা নৌযান ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করেই এই ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানি গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বন্দর আব্বাসের পূর্বাঞ্চল এবং বিমানবন্দরের কাছাকাছি উপকূলীয় এলাকায় অন্তত তিনটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে মার্কিন হামলায় ঠিক কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানি হয়েছে, সে বিষয়ে ওয়াশিংটন বা তেহরান কোনো পক্ষই বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই আগ্রাসী পদক্ষেপের জবাবে চুপ থাকেনি তেহরান। হামলার পরপরই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) মার্কিন ‘আগ্রাসনের উৎস’ হিসেবে চিহ্নিত একটি বিমানঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। 

আরও পড়ুন: যুদ্ধের মধ্যেও আল-আকসায় ঈদের জামাত, অংশ নিলেন হাজারো মুসল্লি

আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে ওই মার্কিন ঘাঁটিতে সফলভাবে আঘাত হানা হয়েছে, যেখান থেকে ইরানের বিরুদ্ধে বুধবারের অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল। তবে সামরিক কৌশলগত কারণে এই বিমানঘাঁটিটির সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করেনি ইরান। আইআরজিসির পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, যেকোনো ধরনের মার্কিন আগ্রাসনের জবাব দেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন যদি আবারও কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে তার পাল্টা জবাব হবে ‘আরও কঠোর ও তীব্র’। 

এর পাশাপাশি, পারস্য উপসাগরে দুই দেশের নৌবাহিনীর মধ্যেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। তাসনিম বার্তা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় রাডার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া একটি মার্কিন তেলবাহী জাহাজের মুখোমুখি হয় আইআরজিসি নৌবাহিনী। ইরানি নৌ কমান্ডোরা তাৎক্ষণিক ও অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নিলে মার্কিন জাহাজটি সেখান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয় বলে দাবি করেছে তেহরান।

এই সামরিক সংঘাত এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে ঘটল, যখন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করতে ওমানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের এই উত্তাপ সরাসরি এসে পড়েছে হোয়াইট হাউসের আলোচনার টেবিলে। বুধবার ওয়াশিংটনে মন্ত্রিসভার এক বিশেষ বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ও অনমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করেছেন। 

ট্রাম্প মন্তব্য করেন, ইরান বর্তমানে ‘প্রায় নিঃশেষিত অবস্থায়’ এই শান্তি আলোচনা চালাচ্ছে এবং তেহরান চুক্তি করতে আগ্রহী হলেও এখনো মার্কিন শর্ত অনুযায়ী চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। 

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আমরা এই পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট নই, তবে শেষ পর্যন্ত সন্তুষ্ট হব। অন্যথায় আমাদের ফিরে গিয়ে কাজ শেষ (যুদ্ধ জয়) করতে হবে। 

ট্রাম্প আরও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে তার বর্তমান যুদ্ধকৌশল বা সামরিক সিদ্ধান্তে কোনো ধরনের প্রভাব পড়বে না।

একই সঙ্গে, শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে ইরান ও ওমান যৌথভাবে হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল তদারকি করবে—ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের এমন একটি প্রতিবেদন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ট্রাম্প। ওমান সম্পর্কে কড়া মন্তব্য করে তিনি জোর দিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালি কোনো নির্দিষ্ট দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না, এটি সবার জন্য উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক জলসীমা এবং এটি সবসময় খোলাই থাকবে। ট্রাম্পের এই মন্তব্য প্রকাশের পরপরই মার্কিন সামরিক বাহিনী বন্দর আব্বাসে নতুন করে বোমা বর্ষণ করায় বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার টেবিল ও যুদ্ধক্ষেত্র দুই জায়গাতেই নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখার কৌশল নিয়েছে।

বিশ্বের অন্যতম প্রধান এবং কৌশলগতভাবে সবচেয়ে সংবেদনশীল জ্বালানি পরিবহণ রুট হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে এই সামরিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তেহরান এই রুটটিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করায় এবং মার্কিন হামলার কারণে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্ববাজারে খনিজ তেলের দাম নতুন করে লাফিয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিন মাস ধরে চলা এই সংঘাতের কারণে ইতিমধ্যেই হাজারো মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। 

আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদদের মতে, নতুন করে এই হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা চলমান নাজুক যুদ্ধবিরতিকে সম্পূর্ণভাবে ভেস্তে দেওয়ার উপক্রম করেছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে বিস্তৃত হচ্ছে। ইসরাইল ইতিমধ্যেই লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় টাইর শহর ও জাহরানি নদীর অববাহিকাকে ‘যুদ্ধাঞ্চল’ ঘোষণা করে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে, যেখানে সাম্প্রতিক হামলায় নারী ও শিশুসহ ৩১ জন নিহত হয়েছেন। ফলে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই মুখোমুখি অবস্থান যদি অবিলম্বে থামানো না যায়, তবে তা একটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মহাযুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়