বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থীরা ক্ষুব্ধ
ঢাকা: ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে সমর্থন পাওয়া না পাওয়া নিয়ে উত্তাপ বেড়েই চলেছে। সঠিক সময়ে সমর্থন ঘোষণা না করায় সমর্থন পাওয়ার আশায় প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি অনেক প্রার্থী। আশা করেও সমর্থন না পাওয়ায় নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অনেকেই। প্রচারণাও শুরু করে দিয়েছেন তারা। আর এসব নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তারা। প্রার্থীদের সাথে আলাপকালে এসব তথ্য জানা গেছে।
সমর্থন না পাওয়া প্রার্থীরা বলছেন, আশা ছিলো সমর্থন পাবো। সেজন্য মনোনয়ন জমা দিয়েছিলাম। দল থেকেও সমর্থন দেয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছিলো। দল সমর্থন দেয়নি, তা মানলাম, কিন্তু প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনও এ বিষেয়ে দল থেকে কিছু জানানো হয়নি। তাই প্রার্থিতাও প্রত্যাহার করিনি। এতে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। আগে সমর্থনের বিষয়ে জানানো হলে জামানতের টাকাও ফেরত পেতাম, এখন তো তাও পাচ্ছি না।
জানা গেছে, এবারের সিটি নির্বাচনে কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে সমর্থন দেয়ার বিষয়ে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে বিএনপি। অর্ধেকের বেশি নতুন মুখকে সমর্থন দেয়া হয়েছে যারা বিএনপি সমর্থিত ‘আদর্শ ঢাকা উন্নয়ন’ এর ব্যানারে নির্বাচন করবে।
জানা গেছে, সাধারণ কাউন্সিলরদের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণে ১, ২, ৩, ৫, ৭, ৮, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৭, ১৮, ২৩, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৪, ৩৫, ৩৭, ৩৮, ৪৩, ৪৫, ৪৬, ৪৭, ৫০, ৫১, ৫২, ৫৫, ৫৬, ৫৭ এবং ঢাকা উত্তরে ১, ২, ৪, ৫, ৬, ৭, ৯, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩৩, ৩৪, ৩৫ ও ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে সমর্থন পেয়েছেন নতুন মুখ। এছাড়া সংরক্ষিত মহিলা আসনে ঢাকা দক্ষিণে ১, ২, ৩, ৪, ৮, ৯, ১১, ১৪, ১৫, ১৮, ১৯ এবং ঢাকা উত্তরে ১, ২, ৪, ৫, ৬, ৭, ৯, ১১ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ডে সমর্থন পেয়েছে নতুন মুখ। একাধিক শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী থাকার কারণে ৭টি ওয়ার্ডে এখনও সমর্থন চূড়ান্ত করতে পারেনি বিএনপি। এতে করে বাদ পড়েছেন বিএনপি সমর্থিত প্রভাবশালী ও আলোচিত-সমালোচিত একাধিক সাবেক কাউন্সিলর। সমর্থন না পাওয়ায় ও সঠিক সময়ে সমর্থনের বিষয়টি না জানানোয়, প্রার্থিতা প্রত্যাহর করতে না পারায় নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অনেকে।
বিএনপির সমর্থন বঞ্চিত একাধিক প্রার্থী জানান, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে দল যাদের সমর্থন দিয়েছে তারা অনেকেই বিএনপিকে ‘ওউন’ করেন না। এলাকায় তারা অতটা পরিচিতও নন। তাদের অনেকেই নানা অভিযোগ অভিযুক্ত। ভোটের মাঠে প্রতিপক্ষের সামনে তারা দাঁড়াতেই পারবেন না। কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতাদের ম্যানেজ করে তারা সমর্থন আদায় করে নিয়েছেন। তারা মনে করেন, ঢাকা মহানগরের অনেক ওয়ার্ডেই প্রার্থী বাছাই ও সমর্থনের ক্ষেত্রে দল সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। তারা নির্বাচনের মাঠ থেকে সরবেন না।
ঢাকা উত্তরের ৩৪ নং ওয়ার্ডে বিএনপির সমর্থন পেয়েছেন মো. ওসমান গণি। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে বিএনপির কোন পদে নেই। আগে যুবদল করতেন।
ওসমান গনি বলেন, “দলের উচিৎ ছিলো মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই কাকে সমর্থন দেয়া হয়েছে তা জানিয়ে দেয়া। তাহলে ভুল বোঝাবুঝির অবসান হতো। এছাড়া মনোনয়ন প্রত্যাহার করলে জামানতের টাকাও ফেরৎ পাওয়া যেত, যা এখন পাওয়া যাবে না।”
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ৪০ নং ওয়ার্ডের বিএনপি নেতা তারেক জামাল জানান, এই ওয়ার্ডে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মকবুল ইসলাম খান টিপুকে সমর্থন দেয়া হয়েছে। তিনি জেলে রয়েছেন। জামিন না পেলে জেলে থেকেই নির্বাচন করবেন। আমাকে দল থেকে বলা হয়েছিলো সমর্থন দেয়া হবে। প্রত্যাহার করতেও বলা হয়নি। প্রচারণা শুরু করে দিয়েছি আমি স্বতন্ত্র নির্বাচন করবো।”
দক্ষিণের নং ওয়ার্ড সাবেক ৭৪ থেকে দলীয় সমর্থন দেয়া হয়েছে কাজী আবুল বাশারের স্ত্রীকে। কাজী আবুল বাশার এ ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার ও মহানগর কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক। এবার তিনি দক্ষিণে মেয়র পদের জন্য মনোনয়ন দাখিল করেছেন। এ ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী জাসাস দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন।
তিনি জানান, সাবেক কমিশনার আবুল বাশারের স্ত্রীকে দলীয় সমর্থন দেয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি বিএনপির কোনো পদে নেই । আমি স্বতন্ত্র নির্বাচন করবো। ঠেলাগাড়ি মার্কা পেয়ে ইতোমধ্যে এলাকায় প্রচারণাও শুরু করে দিয়েছেন তিনি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে সমর্থন দেয়া হয়েছে যুবদল নেতা ইমরানুল ইসলামকে। এই ওয়ার্ডেও জাসাস ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহ-সভাপতি হায়দার আলী বাবলা নামে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। মাঠ ছাড়ছেন না তিনি। জাসাস ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি আলহাজ জাহাঙ্গীর শিকদার অভিযোগ করেন, ইমরানুল ইসলাম কিছুদিন আগে যুবদলে যোগ দিয়েছেন। বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি মাঠে ছিলেন না। তাই অযোগ্য প্রার্থীকে সমর্থন দেয়া হয়েছে। তাই ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা বাবলা মাঠ ছাড়বেন না। তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
এদিকে ঢাকা উত্তরের ৩২ নম্বর বজলুর রহমান বলেন, “কীভাবে দলের সমর্থন দেয়া হলো বুঝতে পারছি না। আমার ওয়ার্ডে যাকে দেয়া হয়েছে তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের সঙ্গে বোঝাপড়া করে চলেন। ২০০৮-এর জাতীয় নির্বাচনে তিনি বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের সঙ্গে প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা করেছেন।”
তিনি বলেন, “আমি ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হিসেবে প্রতিটি ইউনিটের কর্মীরা আমার সঙ্গে আছেন। আর দলের কেন্দ্রীয় ও মহানগর থেকে আমাকে কোন নির্দেশনা দেয়া হয়নি। আমি নির্বাচন করবই।”
বজলুর রহমান বলেন, “কেবল আমার ওয়ার্ডেই নয়, ২৮ নম্বরে অধ্যাপক সাত্তার ভূঁইয়া ও ৩০ আবুল হাসেম হাসু নামে যে দুইজনকে সমর্থন দেয়া হয়েছে তারাও আওয়ামী লীগের পদপদবীধারী নেতা।”
তবে বিএনপি বলছে, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে প্রার্থীকে চুড়ান্ত সমর্থন দেয়ার আগে প্রয়োজনীয় মতবিনিময় ও বৈঠক করতে পারেনি বিএনপির দায়িত্ব প্রাপ্তরা। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের যেমন নিরাপদ অবস্থানে থেকে কাজ করতে হয়েছে তেমনি আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে সমর্থন প্রত্যাশীদেরও। বিএনপির সমর্থন প্রত্যাশী বেশিরভাগ প্রার্থীকেই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও দাখিল করতে হয়েছে প্রতিনিধিদের মাধ্যমে। ফলে ভুল বোঝাবুঝি নিরসন ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে আগেভাগে সমর্থনের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে পারেননি দায়িত্বপ্রাপ্তরা।
নিউজবাংলাদেশ/আরআর/এজে
নিউজবাংলাদেশ.কম








