বিনোদন ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:১৮, ৭ জুন ২০২৬
আপডেট: ১৫:১৮, ৭ জুন ২০২৬

‘কাফফরা এত ভয়াবহ হবে ভাবিনি’

‘কাফফরা এত ভয়াবহ হবে ভাবিনি’

ফাইল ছবি

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে তীব্র আলোচনা ও নেতিবাচক সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছেন দেশের খ্যাতনামা চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সফরে থাকা এই নির্মাতাকে নিয়ে দেশজুড়ে নানা গুঞ্জন ও অপপ্রচার ছড়ানোর প্রেক্ষাপটে অবশেষে দীর্ঘ নীরবতা ভেঙেছেন তিনি। 

রবিবার (০৭ জুন) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ ও আবেগঘন স্ট্যাটাসে তিনি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ, পরবর্তী সময়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি, নিজের দীর্ঘ দুই দশকের পেশাগত সততা এবং বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্কের অভিযোগ নিয়ে দ্ব্যর্থহীন অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

চলমান এই পরিস্থিতিকে তিনি সামাজিক মাধ্যমে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সংকট হিসেবে বর্ণনা করে এর তীব্র ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। একই সাথে যেকোনো জাতীয় সংকটে তিনি অতীতেও যেভাবে সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন, ভবিষ্যতেও সেই অবস্থানে অটল থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

ফেসবুক পোস্টে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী উল্লেখ করেন, দেশের একটি বিশেষ ও ক্রান্তিকালীন সময়ে ভালো কিছু করার উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তবে জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য যে এত বড় ব্যক্তিগত বা সামাজিক খেসারত দিতে হবে, তা তার কল্পনার বাইরে ছিল। 

নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি লেখেন, প্রত্যেকটি ভালো কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট ‘কাফফারা’ বা মূল্য দিতে হয় এই ধ্রুব সত্যটি জেনেই তিনি প্রশাসনে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু দায়িত্ব ছাড়ার পর তাকে কেন্দ্র করে যে ধরনের কুৎসিত ও সুসংগঠিত অপপ্রচার চালানো হবে, তা তিনি কখনোই ভাবেননি।

তাকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন মহলের সমালোচনা ও নেতিবাচক মন্তব্যের জবাবে ফারুকী অত্যন্ত কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন। 

তিনি জানান, বর্তমানে এমন কিছু মানুষ বা গোষ্ঠী তাকে নিয়ে মন্তব্য করছেন, যাদের সাথে তার ব্যক্তিগত কিংবা পেশাগত কোনো স্তরেরই নূন্যতম সংযোগ ছিল না। 

তার ভাষায়, এসব ব্যক্তি কোনোদিনই তার বা সমসাময়িক প্রগতিশীল সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ‘সিলেবাসে’ ছিলেন না, এমনকি ঘরোয়া আড্ডাতেও তাদের নাম কখনো উচ্চারিত হয়নি। সমসাময়িক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক এই ব্যক্তিদের মন্তব্যের সূত্র ধরে মূলধারার সাংবাদিকরা যখন প্রতিনিয়ত ফোন করে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চান, তখন পুরো বিষয়টিকে তিনি চরম বিব্রতকর এবং একই সাথে তার উপদেষ্টা হওয়ার খেসারত বা ‘কাফফারা’ হিসেবে অভিহিত করেন। 

তবে একই সাথে তিনি দৃঢ়তার সাথে দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে পরিচালিত এই সম্মিলিত মিথ্যাচার এবং সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডাই আসলে প্রমাণ করে যে, উপদেষ্টা হিসেবে নিজের সংক্ষিপ্ত মেয়াদে তিনি সঠিক পথেই ছিলেন এবং অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পেরেছেন।

আরও পড়ুন: বিয়ে করলেন উপস্থাপিকা দীপ্তি চৌধুরী

চলমান বিতর্কের মধ্যে তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অর্থনৈতিক ও পেশাগত উৎস নিয়ে ওঠা বিভিন্ন প্রশ্নেরও অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও তথ্যবহুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন এই নির্মাতা। 

ফারুকী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তার বিনোদন ও বিজ্ঞাপনী ক্যারিয়ারের শতভাগই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং স্বাধীন করপোরেট ব্র্যান্ডগুলোর ওপর নির্ভরশীল। টেলিভিশন নাটক ও বিজ্ঞাপনী সংস্থায় নিজস্ব সিগনেচার ও স্বতন্ত্র পরিচালনার ধারা তৈরি করেই তিনি আজকের অবস্থানে এসেছেন এবং তার যা কিছু সামাজিক বা আর্থিক অর্জন, তা সম্পূর্ণভাবে সাধারণ দর্শকের ভালোবাসার ফল। ক্যারিয়ারের কোনো পর্যায়েই কাজ পাওয়ার জন্য তাকে কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকারের দ্বারে দ্বারে ঘুরে হাত কচলাতে হয়নি, বরং নিজস্ব সৃজনশীল কাজ দিয়েই তিনি দেশের অডিও-ভিজ্যুয়াল ইন্ডাস্ট্রির গতিপ্রকৃতি বদলে দিয়েছেন।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্কের গুঞ্জনকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি করে ফারুকী বলেন, বিগত সরকারের আমলে তো বটেই, ক্যারিয়ারের কোনো সময়েই কোনো সরকারের সাথে তার প্রতিষ্ঠানের কোনো ধরনের নিয়মিত বা লাভজনক বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল না; কারণ আমলাতান্ত্রিক বা সরকারি কাজ তার প্রাতিষ্ঠানিক নীতির সাথে খাপ খায় না। দীর্ঘ বিশ বছরেরও বেশি সময়ের পেশাগত জীবনে তার প্রতিষ্ঠান যে দুই-চারটি সরকারি কাজ করেছে (যেমন: বিমান বাহিনীর ‘অনির্বাণ’, নৌবাহিনী এবং ভ্যাট সংক্রান্ত সচেতনতামূলক কিছু প্রজেক্ট), সেগুলোও নির্মাতা কিবরিয়ার কো-ডিরেকশনে করা হয়েছিল। অত্যন্ত সীমিত পরিসরের এই প্রজেক্টগুলোর কাজও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর বিশেষ অনুরোধেই করা হয়েছিল, যা তার সমগ্র ক্যারিয়ারের মোট কাজের এক শতাংশের (১%) কম।

বিজ্ঞাপনী পাড়ায় নিজের ‘ঘাড়ত্যাড়া’ বা আপসহীন ও বিদ্রোহী স্বভাবের কারণে বড় বড় বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো (এজেন্সি) তাকে কাজ দিতে বরাবরই কিছুটা অস্বস্তিতে থাকত উল্লেখ করে তিনি জানান, ২০ বছরে শীর্ষস্থানীয় এজেন্সিগুলোর সাথে তিনি ৫টি কাজ করেছেন কিনা সন্দেহ, যেখানে সমসাময়িক অন্যান্য চলচ্চিত্র নির্মাতারা হয়তো শত শত কাজ করেছেন। এই প্রতিকূলতার মাঝেও শুধুমাত্র কিছু প্রথম সারির ব্র্যান্ডের গভীর বিশ্বাস এবং দর্শকদের কাছে কাজের উপযোগিতা বা ‘টকাবিলিটি’ প্রমাণ করেই তিনি স্বকীয়তায় টিকে ছিলেন। ফলে কোনো নির্দিষ্ট এজেন্সি সিন্ডিকেট বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ওপর তার ক্যারিয়ার কখনোই দাঁড়িয়ে ছিল না।

স্ট্যাটাসের শেষাংশে নিজের রাজনৈতিক ও সামাজিক আদর্শিক অবস্থান পরিষ্কার করে সাবেক এই সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, দেশের যেকোনো জাতীয় ও ঐতিহাসিক সংকটময় মুহূর্তে তিনি সবসময়ই সাধারণ মানুষের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। 

উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যদি তার জন্ম হতো বা তিনি বেঁচে থাকতেন, তবে নিশ্চিতভাবেই মেহনতি মানুষের পক্ষে থাকতেন। ঠিক একইভাবে, চব্বিশের ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লব ও ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময়েও তিনি কোনো ব্যক্তিগত হিসাব-নিকাশ না করে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং নিপীড়িত মানুষের পক্ষেই রাজপথে ও সামাজিক মাধ্যমে সোচ্চার ছিলেন।

নিজের মূল্যবান সময় নষ্ট করে এই ধরনের ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রোপাগান্ডার জবাব দেওয়াকে তিনি অত্যন্ত বিরক্তিকর বলে মনে করেন। 

সামাজিক মাধ্যমে কুৎসা রটনাকারীদের তীব্র সমালোচনা করে ক্ষোভের সাথে তিনি বলেন, কিছু বুদ্ধিহীন ও সংকীর্ণমনা মানুষের ছড়ানো অপপ্রচারের উত্তর দিতে গিয়ে নিজের অত্যন্ত মূল্যবান কিছু সময় ‘সদকা’ বা অপচয় করতে হলো। ফারুকীর এই দীর্ঘ ও বিস্তারিত আত্মপক্ষ সমর্থনের পর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে; সচেতন নেটিজেনদের একাংশ তার এই সৎ ও সাহসী বক্তব্যকে সাধুবাদ জানালেও, অন্য অংশটি এখনও তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়