কনে বদলের রহস্যে বাসররাতে লঙ্কাকাণ্ড
ছবি: সংগৃহীত
বিয়ের আনন্দ, নতুন জীবনের স্বপ্ন আর বাসরঘরের রঙিন আবহ সবই মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেল এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগে। বাসররাতে নববধূ মুখ ধোয়ার পর বর রায়হান কবিরের দাবি, যাকে বিয়ের আগে দেখানো হয়েছিল, এই নারী তিনি নন; মেকআপের আড়ালে কনে বদলে দেওয়া হয়েছে। এই ‘কনে বদল’ নাটককে কেন্দ্র করে ঠাকুরগাঁও জেলাজুড়ে এখন তোলপাড় চলছে। পাল্টাপাল্টি মামলা আর দীর্ঘ টানাপড়েন শেষে শেষপর্যন্ত বিয়ের পিঁড়ি থেকে বরকে যেতে হয়েছে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে।
ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের জুলাই মাসের শেষে। জিয়ারুল হকের মেজো মেয়ের সঙ্গে পীরগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর এলাকার মৃত ইব্রাহীমের ছেলে রায়হান কবিরের বিয়ে হয়।
বিয়ের পরই বরপক্ষের দাবি, বাসর রাতে কনের মুখ ধোয়ার পর তারা বুঝতে পারেন যে, যাকে বিয়ের আগে দেখানো হয়েছিল সেই নারী বাসরঘরে বসে থাকা নববধূ নন, বরং অন্য কেউ।
তারা অভিযোগ করেন, অতিরিক্ত মেকআপের আড়ালে কৌশলে কনে বদল করা হয়েছে।
বর রায়হান কবিরের মামা বাদল মিঞা সাংবাদিকদের জানান, ঘটক মোতালেবের মাধ্যমে রায়হানের জন্য পাত্রী খোঁজা হচ্ছিল। জুলাই মাসের শেষের দিকে রাণীশংকৈলের শিবদিঘী এলাকার একটি চায়ের দোকানে ঘটক একটি মেয়েকে দেখান। মেয়েটিকে পছন্দ হলে তারা বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে মেয়েপক্ষের লোকজন ছেলেপক্ষের বাড়িতে এসে আত্মীয়তার প্রস্তাব দেন এবং দ্রুত বিয়ে সম্পন্ন করার অনুরোধ জানান।
বাদল আরও বলেন, রায়হানের দুলাভাই মানিক মালয়েশিয়া প্রবাসী। তিনি দ্রুত বিদেশে ফিরে যাবেন এ কারণে বিয়ের কাজ দ্রুত শেষ করতে তারা তাড়াহুড়া করেন। ১ আগস্ট রাত ১১টায় দুইটি মাইক্রোবাসে করে মেয়ের বাড়িতে যান, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ভোর ৪টার দিকে বাড়ি ফেরেন। বিয়ের রাতে অতিরিক্ত মেকআপের কারণে কনে বদলের বিষয়টি বুঝতে না পারলেও বাসর রাতে মুখ ধোয়ার পর রায়হান বুঝতে পারেন যে তাকে প্রতারিত করা হয়েছে। পরের দিন (২ আগস্ট) তারা কনেকে তার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন এবং ঘটক ও মেয়ের বাবাকে পরিকল্পিতভাবে প্রতারণার অভিযোগ করেন।
আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুন, পুড়ল ৫০০ বসতি
ঘটনাটি মীমাংসার জন্য দুই পক্ষ একাধিকবার আলোচনা করলেও কোনো সমাধান হয়নি। এরপর ২৭ আগস্ট কনের বাবা জিয়ারুল হক রায়হান কবির ও তার দুলাভাই মানিক হাসানকে আসামি করে ঠাকুরগাঁও আদালতে মামলা করেন। এর কয়েক দিন পর ২ সেপ্টেম্বর রায়হান কবির কনের বাবা ও ঘটক মোতালেবকে আসামি করে পাল্টা মামলা করেন।
উভয়পক্ষের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার (১৯ জানুয়ারি) ঠাকুরগাঁও আদালত রায়হান কবিরের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
কনের বাবা জিয়ারুল হক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার কোনো ছেলে সন্তান নেই। তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, মেজো মেয়ে জেমিন আক্তার রাণীশংকৈল মহিলা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী।
তিনি বলেন, মেয়ে দেখানো হয়েছে তাদের বাসায়ই, এবং বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রায় ৭০ জন বরযাত্রী উপস্থিত ছিল। এই পরিস্থিতিতে কনে বদলের অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য নয়।
জিয়ারুল হক আরও অভিযোগ করেন, বিয়ের আগে কোনো যৌতুকের কথা বলা হয়নি, কিন্তু বিয়ের পরদিনই তারা ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। তিনি জমি বিক্রি করে টাকা দেওয়ার কথাও বলেছেন, কিন্তু সময় না দেয়ায় তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
ঘটক মোতালেব বলেন, তিনি কোনো ভুল মেয়ে দেখাননি। মেয়েটিকে তার বাবার বাসাতেই দেখানো হয়েছিল। পরে ছেলেপক্ষ নিজেরাই দ্রুত বিয়ে সম্পন্ন করেছে। ঘটনার পরের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
ঠাকুরগাঁও আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও ছেলেপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন বলেন, ছেলেপক্ষের অভিযোগ হলো—মেয়েপক্ষ ও ঘটক মিলে প্রতারণার মাধ্যমে কনে বদল করেছে। প্রথম দিকে মীমাংসার শর্তে রায়হান কবির জামিনে ছিলেন, কিন্তু কোনো সমাধান না হওয়ায় বিষয়টি এখন পুরোপুরি বিচারাধীন। তিনি বলেন, আদালতের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে।
এই ঘটনা ঠাকুরগাঁও জেলায় তীব্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও এখন সব নজর আদালতের বিচার কার্যক্রমে। মামলার পরবর্তী শুনানি ও প্রমাণ-প্রস্তাবের ভিত্তিতে কনের বদলের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








