News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৪৩, ২৩ মার্চ ২০২৬

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পোশাকের রেকর্ড দরপতন, এগিয়ে ভিয়েতনাম-ভারত

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পোশাকের রেকর্ড দরপতন, এগিয়ে ভিয়েতনাম-ভারত

ছবি: নিউজবাংলাদেশ

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের আধিপত্য এখন এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশেষ করে ইউরোপের বাজারে পোশাকের গড় দাম উদ্বেগজনক হারে কমেছে, যেখানে ভিয়েতনাম, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো তাদের পণ্যের দাম বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট এবং কাঁচামাল আমদানিতে ধীরগতির কারণে দেশের প্রধান এই রপ্তানি খাত এখন বহুমুখী চাপের সম্মুখীন।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের গড় দাম কমেছে প্রায় ৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এর বিপরীতে একই সময়ে ভিয়েতনামের পোশাকের দাম বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ, ভারতের প্রায় ২ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার ১৪ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ, যেখানে প্রতিযোগীরা মূল্য বাড়াতে পেরেছে, সেখানে বাংলাদেশকে বাজার ধরে রাখতে উল্টো কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে।

দামের এই নিম্নমুখী প্রবণতা সরাসরি প্রভাব ফেলছে রপ্তানি আয়ে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে পোশাক খাতে রপ্তানি আয় কমেছে ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। একই সময়ে কাঁচামাল আমদানির জন্য খোলা ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ, যা উৎপাদন ও সরবরাহ চেইনে ধীরগতির ইঙ্গিত দেয়। এর প্রভাব পড়েছে প্রধান বাজারগুলোতেও যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি কমেছে প্রায় ১ শতাংশ এবং সবচেয়ে বড় গন্তব্য ইউরোপে হ্রাস পেয়েছে ২৫ শতাংশের বেশি।

এই পরিস্থিতির পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধাবস্থা এবং মার্কিন শুল্কনীতির প্রভাব বড় ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাও সংকটকে বাড়িয়ে তুলেছে। দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে, আর আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সামগ্রিক রপ্তানি খরচও বেড়েছে। ফলে কারখানা সচল রাখা এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ধরে রাখতে গিয়ে উদ্যোক্তারা কম দামে অর্ডার নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

আরও পড়ুন: জ্বালানি সংকটেও পেট্রোল পাম্প বন্ধের কোনো আশঙ্কা নেই

রপ্তানিকারকদের মতে, বিশ্বব্যাপী দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে পোশাকের চাহিদায়। অর্ডার কমে যাওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অনেক প্রতিষ্ঠান কম লাভে, এমনকি কখনও লোকসানেও পণ্য বিক্রি করছে। বিজিএমইএর পরিচালক রশিদ আহমেদ হোসাইনী বলেন, সব জায়গায় দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, ফলে অর্ডারও কমছে। ফ্যাক্টরি চালু রাখা এবং ঋণের চাপ সামলাতে রপ্তানিকারকদের কম দামে অর্ডার নিতে হচ্ছে।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ইউরোপীয় বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে উৎপাদন কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন জরুরি। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে আমদানি করা কাপড় দিয়ে পোশাক উৎপাদন করা হয়। তবে ভবিষ্যতে শুল্ক সুবিধা ধরে রাখতে ‘টু-স্টেজ কনভার্শন’ শর্ত পূরণ করতে হবে অর্থাৎ সুতা ও কাপড় উভয়ই দেশেই উৎপাদন করতে হবে। এ বিষয়ে সিপিডির ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ওয়ান-স্টেজ কনভার্শনে শূন্য শুল্ক সুবিধা থাকলেও জিএসপি প্লাস সুবিধার ক্ষেত্রে টু-স্টেজ কনভার্শন বাধ্যতামূলক হবে, তাই স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে, ইউরোপের সামগ্রিক বাজারও সংকুচিত হচ্ছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইউরোপের মোট পোশাক আমদানি আগের বছরের তুলনায় কমেছে প্রায় সাড়ে ১৫ শতাংশ। ফলে ছোট হতে থাকা বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়ে উঠছে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশি পোশাক খাত বর্তমানে এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে বৈশ্বিক চাহিদা কমছে, অন্যদিকে প্রতিযোগীরা শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, কাঁচামালে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং বাজার বৈচিত্র্য আনার মতো কৌশলগত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়