News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৯:২৬, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬

নতুন পে-স্কেল নিয়ে বিপাকে সরকার

নতুন পে-স্কেল নিয়ে বিপাকে সরকার

ফাইল ছবি

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর সংকটে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে এই মুহূর্তে পে-স্কেল বাস্তবায়নে অপারগতা প্রকাশ করা হলেও, একে সময়ক্ষেপণ হিসেবে দেখছেন কর্মচারীরা। 

নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পে-স্কেল কার্যকর করা হবে- সরকারের এমন ঘোষণায় সচিবালয় থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। 

তারা আশঙ্কা করছেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি অনিশ্চয়তায় পড়ে যেতে পারে। এ কারণে অন্তর্বর্তী সরকারকেই পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছেন তারা।

তাদের দাবি, নির্বাচিত নতুন সরকারের অপেক্ষায় না থেকে বর্তমান সরকারকেই একটি সম্মানজনক বেতন কাঠামো কার্যকর করতে হবে। অন্যথায় বড় ধরনের আন্দোলনের পথে হাঁটার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তীব্র অর্থ সংকট ও সীমিত সময়ের কারণে নতুন পে-স্কেল এই মুহূর্তে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। 

অর্থ উপদেষ্টা একাধিকবার জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার পে-স্কেল কার্যকর করতে পারবে না; তবে একটি সুপারিশ প্রণয়ন করে তা নির্বাচিত সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। 

মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) জ্বালানি উপদেষ্টাও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, এই সরকার নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সক্ষমতা রাখে না।

অর্থ বিভাগের একটি সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১০৬ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে এই অর্থ সংস্থান করা সম্ভব নয় বলে তারা মনে করছেন। এর পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করতে গিয়ে সরকারের ব্যয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেড়ে গেছে। ফলে রাজস্ব ঘাটতি, নির্বাচন ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ সব মিলিয়ে সরকার আর্থিকভাবে চরম সংকটে রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না থাকায় এই ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নির্বাচন-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্যয় সংকোচনের চাপ আরও তীব্র হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত থেকে আপাতত সরে এসেছে।

আরও পড়ুন: সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য সুখবর: অর্থ উপদেষ্টা

এ অবস্থায় সচিবালয় ও এর বাইরের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। 

বিভিন্ন স্তরের কর্মচারীরা জানিয়েছেন, বিদ্যমান পে-স্কেলে তারা জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে পারছেন না। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাসাভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়ের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। যদিও নির্দিষ্ট হারে কিছু ভাতা তারা পাচ্ছেন, তবে সেটিকে তারা বর্তমান বাস্তবতায় পর্যাপ্ত মনে করছেন না।

সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে বেতন বৈষম্য দূর করার দাবি জানিয়ে আসছে। সংগঠনগুলোর নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত নতুন ও সময়োপযোগী পে-স্কেল বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলনে যাওয়ার বিকল্প থাকবে না। 

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ সরকারি কর্মচারীরা যদি আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভোগেন, তাহলে প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা এই বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, কাঠামোগত রাজস্ব সংস্কার ও কঠোর ব্যয় ব্যবস্থাপনা ছাড়া বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধি করলে বাজেট ঘাটতি আরও বেড়ে যেতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। নির্বাচন-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ডক্টর জাহিদ হোসেন বলেন, পে-স্কেল ইস্যুতে সরকার অত্যন্ত কঠিন সমীকরণের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি, অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ- এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পুরোপুরি পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিবর্তে বিকল্প পথ অনুসন্ধান করতে পারে। আলোচনায় রয়েছে ধাপে ধাপে পে-স্কেল কার্যকর করা, নির্দিষ্ট কিছু ভাতা বৃদ্ধি করা অথবা নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব। সময়সীমা নির্ধারণ করে আংশিক বাস্তবায়নের বিষয়টিও বিবেচনায় আছে বলে জানা গেছে। তবে এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা আসেনি।

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এই টানাপোড়েন কবে এবং কীভাবে সমাধানের পথে যাবে সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়