‘দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ’
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ ১৭ বছর পর ঢাকার বাইরে প্রথম কোনো রাজনৈতিক সফরে এসে নিজের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) দুপুরে সিলেটের ঐতিহাসিক সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দেন, দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়—সবার আগে বাংলাদেশ। করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।
জনসভায় তারেক রহমান বলেন, ষড়যন্ত্রকারীরা এখনো সক্রিয়। দেশে-বিদেশে বসে যারা ষড়যন্ত্র করছেন, তাদের থেকে সচেতন থাকতে হবে। দেশের মানুষ আগেও ঐক্যবদ্ধ হয়ে ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেছে। আগামীতেও জনগণ ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবে।
তিনি দাবি করেন, গত ১৬ বছরে দেশে ভোট ও রাজনৈতিক অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে; “ব্যালট ছিনতাই”, “আমি-ডামি”, “নিশিরাতের নির্বাচন”সহ নানা ঘটনা তার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তারেক রহমান বলেন, গত ১৬ বছর এই দেশকে অন্য দেশের কাছে বন্ধক দেয়া হয়েছিল।
এজন্য তিনি আবারও বলেন, দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ।
তিনি দাবি করেন, উন্নয়নের নামে অর্থ লুটপাট করা হয়েছে এবং তা বিদেশে পাচার করা হয়েছে; “এই অবস্থার উন্নয়ন করতে চাই” বলে তিনি পুনরায় ঘোষণা করেন।
তিনি আরও বলেন, যারা পালিয়ে গিয়েছে, যারা বাক-স্বাধীনতা ও ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, তারাই ইলিয়াস আলীর মতো শত হাজার মানুষকে হত্যা করেছে এবং গুম-খুনের মামলা দিয়ে মানুষকে জর্জরিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, লাখ লাখ মানুষের এই জমায়েতের জন্য ২০২৪ সালে হাজারো মানুষ জীবন দিয়েছে; একাত্তরের স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছে ২০২৪ সালের গণতন্ত্রকামী মানুষ এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছে জনতা।
এসময় তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকারের সময় নারীদের বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল এবং তারা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে মা-বোনদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে চায়। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে মাসিক ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা বা প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে এমন পরিকল্পনা তিনি তুলে ধরেন।
আরও পড়ুন: তৃণমূলের গণতন্ত্র ছাড়া নাগরিক সেবা অসম্ভব: তারেক রহমান
তিনি বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে নারীরা অর্থ পেলে তা সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের স্বাস্থ্য ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগে ব্যয় করেন; ফলে স্থানীয় অর্থনীতি সচল হয় এবং নারীর আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, দেশে সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসকের সংখ্যা রোগীর তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে অর্থনৈতিক অক্ষমতার কারণে বহু মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, একটি হাসপাতাল নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ, বাজেট ও টেন্ডারসহ দীর্ঘ সময় লাগে; তাই দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ জরুরি।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল করা বাস্তবসম্মত নয়; নির্দিষ্ট রোগের জন্য নির্দিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা উন্নত দেশগুলোতেও রয়েছে বাংলাদেশেও এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।
তিনি প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, কমিউনিটি পর্যায়ে হেলথ কেয়ার ওয়ার্কারদের মৌলিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে; এতে সাধারণ রোগে ঘরে ঘরে প্রাথমিক সেবা দেওয়া সম্ভব হবে এবং হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও স্থানীয় কমিউনিটি পর্যায়ে শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
কৃষি ও কর্মসংস্থান বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, প্রতিবছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষ বিদেশে যায়; তাদের বড় অংশ অদক্ষ। ফলে তারা দেশের অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত অবদান রাখতে পারে না। তাই কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে, প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ভাষা শিক্ষা যুক্ত করতে হবে যাতে তরুণরা জাপান, ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে দক্ষ হিসেবে কাজ করতে পারে।
কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা বাস্তবতা হিসেবে স্বীকার করে তিনি বলেন, অন্যায় হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষককে প্রতীকী সহায়তা নয়, বাস্তব ও কার্যকর সহায়তা দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি নির্বাচিত হলে সারাদেশে খাল খনন করা হবে এবং কৃষকদের পাশে দাঁড়াবে।
পরিবেশ সুরক্ষার সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক তুলে ধরে তিনি বলেন, নাগরিকের কথা বলার অধিকার থাকলেই শহরের ময়লা ব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণের মতো সমস্যা সমাধান সম্ভব।
তিনি জানান, বিএনপি আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ৮০ কোটি গাছ রোপণের পরিকল্পনা নিয়েছে; প্রতিটি উপজেলায় সরকারি নার্সারির মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে চারা বিতরণ করা হবে।
এসময় তারেক রহমান নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে বলেন, ধানের শীষে ভোট দিন, করব কাজ গড়ব দেশ।
তিনি বলেন, জাতি টেক ব্যাক করে দেশের অর্ধেক পথে এসেছে; ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষের বিজয়ের মধ্য দিয়ে সেই অগ্রযাত্রা পূর্ণতা পাবে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, বেহেশত ও দোজখের মালিক আল্লাহ। যেটার মালিক আল্লাহ সেটা অন্য কেউ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। যারা বিভিন্ন টিকিট দিচ্ছে, যেটার মালিক মানুষ না, কিন্তু সেটার কথা বলে শিরক করছে।
তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগেই কিছু মহল মানুষকে ঠকাচ্ছে এবং ভোটের মাধ্যমে “বেহেশতের টিকিট বিক্রি” করছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, নির্বাচনের পরে তারা কি করবে?
সমাবেশে তারেক রহমানের বক্তব্যের পাশাপাশি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, সিলেট থেকে যাত্রা শুরু হলো বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার যাত্রা। একই সঙ্গে কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে বিভ্রান্তি ছড়ানো সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
সমাবেশের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। মঞ্চে বক্তৃতা ছাড়াও স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী।
তারেক রহমানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তার সহধর্মিনী ডা. জুবাইদা রহমান এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি সিলেটে এসে প্রথমে হজরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন এবং রাতে তার সহধর্মিনীর পৈতৃক বাড়িতে অবস্থান করেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি/এনডি








