অন্তর্বর্তী সরকারে কিচেন কেবিনেটের প্রভাব, নেপথ্যে ‘সাত সদস্যের’ চক্র
ছবি: সংগৃহীত
সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভেতরে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে একটি সাত সদস্যের প্রভাবশালী ‘কিচেন কেবিনেট’ বা অভ্যন্তরীণ চক্র সক্রিয় ছিল, যারা মূলত সরকারের সব গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতো বলে চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।
সোমবার (২৫ মে) একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া বিশেষ ও খোলামেলা সাক্ষাৎকারে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরের নানা অনালোচিত অধ্যায়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অন্য উপদেষ্টাদের অযাচিত হস্তক্ষেপ, ভূ-রাজনীতি এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। সাবেক এই শীর্ষ কূটনীতিকের এমন বক্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন করে আলোচনার ঝড় তুলেছে।
সাক্ষাৎকারে তৌহিদ হোসেন দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড পরিচালনায় রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও নীতিগত সিদ্ধান্তের বড় অংশই নিয়ন্ত্রিত হতো সাত সদস্যের একটি বিশেষ চক্রের মাধ্যমে। তিনি জানান, এই প্রভাবশালী গ্রুপটি প্রতি মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’য় নিয়মিত গোপনীয় বৈঠকে বসতো এবং প্রশাসনের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা নির্ধারণ করতো।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, কোনো এক বিশেষ উপলক্ষে তাকে যমুনায় এই কিচেন কেবিনেটের একটি বৈঠকে অংশ নিতে হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন যে এই চক্রটি নিয়মিত বসে সিদ্ধান্ত নিতো। সরকারের বাইরে ও ভেতরে ‘কেউ কেউ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে’ এমন গুঞ্জন তার কান পর্যন্ত পৌঁছালেও, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এমন একটি সুনির্দিষ্ট গ্রুপ যে পুরো প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করছিল, তা শুরুতে তার জানা ছিল না।
একই সাথে নিজের কর্মমেয়াদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একাধিক উপদেষ্টার অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব ও হস্তক্ষেপের বিষয়টির তীব্র সমালোচনা করেন তৌহিদ হোসেন। তিনি স্পষ্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে হস্তক্ষেপকারী সেইসব ব্যক্তিদের প্রশাসনিক বা কূটনৈতিক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ছিল না। তা সত্ত্বেও সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তাদের মতামতকে অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক গুরুত্ব দেওয়া হতো, যা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল। এই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন ও কাজের পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার কারণে তিনি নিজের দায়িত্ব থেকে অন্তত তিনবার পদত্যাগ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে প্রতিবারই সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে তাকে অনুরোধ করা হয় এবং জানানো হয় যে, এই ক্রান্তিকালে তার পদত্যাগের বিষয়টি সরকারের জন্য চরম অস্বস্তিকর ও বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করবে যার ফলে শেষ পর্যন্ত আর পদত্যাগ করা সম্ভব হয়নি। এই কারণে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিজের প্রত্যাশার একটি বড় অংশই অপূর্ণ রয়ে গেছে বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।
জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের তড়িঘড়ি করে সই করা বহুল আলোচিত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছেন সাবেক এই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
তৌহিদ হোসেন স্পষ্ট ভাষায় জানান, এই স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রক্রিয়ার সঙ্গে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিন্দুমাত্র কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং এ বিষয়ে তাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছিল। তিনি উল্লেখ করেন, চুক্তিটির পেছনে পুরোপুরি যুক্ত ছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো অদৃশ্য কারণ বা বিশেষ কোনো আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ছিল বলেই অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুততম সময়ে এটি করতে বাধ্য হয়েছিল।
আরও পড়ুন: ১০০ দিনে বদলে যাওয়ার গল্প: নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা
তবে কূটনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী, দেশের কোনো সুনির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা না থাকলে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করার বিষয়টি কোনো অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল না, বরং তা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই যুক্তিযুক্ত ও যথাযথ হতো বলে তিনি মনে করেন।
বিগত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট এবং এর পেছনে কোনো অদৃশ্য শক্তির বা 'ডিপ স্টেট'-এর ভূমিকা ছিল কি না এমন এক প্রশ্নের জবাবে বিশ্ব রাজনীতির জটিল সমীকরণ টেনে আনেন তৌহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ‘ডিপ স্টেট’ বা পর্দার আড়ালের অদৃশ্য শক্তিগুলো সবসময়ই পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি বড় রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকে। তবে তাদের কাজের একটি নির্দিষ্ট ধরন রয়েছে; তারা কখনো স্রোতের বিপরীতে গিয়ে কোনো ঘটনা ঘটায় না। বরং জনমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের ফলে যখন কোনো স্রোত বা গণজোয়ার তৈরি হয়, তখন ডিপ স্টেট সেই স্রোতের সাথে যুক্ত হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য পরিস্থিতিকে নিজস্ব কায়দায় ম্যানিপুলেট বা প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।
এদিকে, ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত চেয়ে নয়াদিল্লিকে চিঠি পাঠানোর বিষয়েও কূটনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে কথা বলেন সাবেক এই উপদেষ্টা।
তিনি স্বীকার করেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথাগত আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া বজায় রাখতে নয়াদিল্লিকে চিঠি দেওয়া হলেও, ভারত যে শেখ হাসিনাকে এত সহজে ফেরত দেবে না বা এই চিঠি যে আদতে তাৎক্ষণিক কোনো কাজে আসবে না, তা তিনি আগে থেকেই খুব ভালোভাবে জানতেন।
বর্তমানে নানামুখী আইনি নিষেধাজ্ঞা এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের মুখে থাকা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে অত্যন্ত দূরদর্শী ও বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন করেছেন এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক। তৌহিদ হোসেন মনে করেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে চিরতরে বিলুপ্ত বা সম্পূর্ণ ‘আউট’ হয়ে গেছে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। দেশের সাধারণ মানুষের স্মৃতিশক্তি খুব একটা দীর্ঘ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষের এই মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগ আবারও দেশের মূলধারার রাজনীতিতে জোরালোভাবে ফিরে আসবে।
তার ব্যক্তিগত অনুমান ও রাজনৈতিক সমীকরণ বলছে, দলটির ওপর বর্তমানের নানাবিধ চাপ থাকা সত্ত্বেও তারা দেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে।
সাক্ষাৎকারের শেষাংশে, সদ্য গঠিত বিএনপি সরকার বা তাদের চলমান রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে এখনই চূড়ান্ত কোনো মূল্যায়ন করতে অস্বীকৃতি জানান তৌহিদ হোসেন।
তবে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এবং দলের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ রক্ষা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারতের মতো তিনটি পরাশক্তির সাথে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে দলটির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় এবং প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই ত্রিমুখী ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন আগামী দিনে তিনি কীভাবে সামলান, তার ওপরই দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ নির্ভর করছে বলে মনে করেন সাবেক এই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








