রামিসা হত্যা মামলার বিচার ৭ দিনের মধ্যে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার কার্যক্রম আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যেই শেষ হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত, ডিএনএ পরীক্ষা, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন সংগ্রহ এবং অভিযোগপত্র প্রস্তুতের কাজ দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আদালতে চার্জশিট দাখিলের প্রক্রিয়াও শেষ হয়েছে বা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সরকার এই মামলাটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
রবিবার (২৪ মে) সচিবালয়ের গণমাধ্যম কেন্দ্রে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত ‘বিএসআরএফ সংলাপ’-এ সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ। সংলাপে সভাপতিত্ব করেন বিএসআরএফ সভাপতি মাসউদুল হক এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক উবায়দুল্লাহ বাদল।
তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের ঘটনাগুলো দেশের মানুষের সহ্যসীমার বাইরে চলে যাচ্ছে এবং সরকার অপরাধীদের কাছে কঠোর বার্তা পৌঁছাতে কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার নীতিতে অবিচল রয়েছে। আজ রবিবার সচিবালয়ের গণমাধ্যম কেন্দ্রে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত ‘বিএসআরএফ সংলাপ’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারের এই দৃঢ় অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। বিএসআরএফ-এর সভাপতি মাসউদুল হকের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক উবায়দুল্লাহ বাদলের সঞ্চালনায় এই বিশেষ সংলাপে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা (পিআইও) সৈয়দ আবদাল আহমদ।
সংলাপে অংশ নিয়ে দেশের সাম্প্রতিক একাধিক শিশু নির্যাতন ও খুনের ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের গভীর উদ্বেগের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ ধরনের ঘটনা মূলত সমাজকাঠামোর গভীর অবক্ষয় ও নৈতিক মূল্যবোধের চরম সংকটের বহিঃপ্রকাশ। আমাদের ধর্মীয় অনুশাসন, ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ ও নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে সমাজ বিচ্যুত হওয়ার কারণেই এমন অপসংস্কৃতির আছর পড়েছে এবং অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে সরকার আইনগত ও বিচারিক ব্যবস্থা দ্রুততম সময়ে নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছে। গত তিন মাসে সংঘটিত প্রতিটি আলোচিত ও নৃশংস অপরাধের ঘটনায় আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত তৎপরতার সাথে দ্রুততম সময়ে আসামিদের গ্রেফতার ও আইনি পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়েছে। পল্লবীর রামিসা হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি; অপরাধ সংঘটিত হওয়ার মাত্র সাত ঘণ্টার মধ্যে মামলার প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে।
পল্লবী থানা এলাকায় শিশু রামিসা হত্যা মামলার তদন্তের অভাবনীয় অগ্রগতি ও কারিগরি দিকগুলো বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধান আসামি গ্রেফতার হওয়ার পর আদালতের বিচারকের খাসকামরায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। আদালতের বিশেষ অনুমতি নিয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে, যার রিপোর্ট মাত্র তিন দিনের মধ্যে অর্থাৎ শনিবার বিকেলেই তদন্ত কর্মকর্তাদের হাতে এসেছে। একই সাথে ময়নাতদন্ত (পোস্টমর্টেম) প্রতিবেদনও সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব অকাট্য বৈজ্ঞানিক ও আইনি তথ্য-উপাত্ত একত্র করে মামলার অভিযোগপত্র প্রস্তুতের কাজ শনিবার রাতেই সম্পন্ন করে পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্রের বরাতে জানা গেছে, চূড়ান্ত অভিযোগপত্রের খসড়া তৈরির পর ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিডিএমএস) সফটওয়্যারে ডেটা এন্ট্রি করার মতো প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রক্রিয়া শেষ করে আজ রবিবারই আদালতে এই চার্জশিট দাখিল করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: রামিসা হত্যা মামলায় সোহেল-স্বপ্নার বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসা লোমহর্ষক বিবরণের বরাতে জানা গেছে, ঘটনার পূর্বে প্রধান আসামি সোহেল রানা ইয়াবা সেবন করেছিলেন এবং মাদকাসক্ত অবস্থায় তিনি শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করেন। ঘটনার সময় নিজের অপরাধ ধামাচাপা দিতে ঘরের একটি কক্ষে নিজের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আটকে রেখেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে মরদেহ টুকরা করে গুম করার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় রামিসার স্বজন ও স্থানীয় প্রতিবেশীরা টের পেয়ে দরজা ভেঙে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েন। সে সময় জানালার গ্রিল ভেঙে প্রধান আসামি সোহেল ও তার এক সহযোগী পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও স্থানীয় জনতা স্বপ্না আক্তারকে তাৎক্ষণিকভাবে আটকে রেখে পুলিশে সোপর্দ করে। আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে অপরাধের সহযোগী হিসেবে স্ত্রীর নাম উঠে আসায় চার্জশিটে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার উভয়কেই অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং স্বপ্না আক্তারকে ইতোমধ্যে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) কোর্টে হাজির করা হয়েছে।
দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের বিশেষ বিচারিক তৎপরতার কথা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সামনে আদালতের নিয়মিত ছুটি থাকলেও এই স্পর্শকাতর মামলার দ্রুত বিচারকাজ সম্পন্ন করার স্বার্থে বিশেষ আদালতের ছুটি বাতিলের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রধান বিচারপতি নিজে এই আদালতের ছুটি বাতিলের বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন এবং বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয় বিষয়টি দেখাশোনা করছে। এর পাশাপাশি রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি নিবিড়ভাবে ও দক্ষতার সাথে পরিচালনার জন্য একজন বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকার আশা করছে, বিশেষ এই আদালতে আগামী ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যেই বিচারিক প্রক্রিয়া সমাপ্ত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সংলাপে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য আমরা বেশ কিছু দিন আগেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক ও দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ পত্র (এক্সট্রাডিশন লেটার) পাঠিয়েছি এবং এই তাগিদ বারবার দেওয়া হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি (এক্সট্রাডিশন ট্রিটি) এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া মেনেই তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে সুনির্দিষ্ট অপরাধের জন্য আদালতের মুখোমুখি করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পুরোপুরি বদ্ধপরিকর।
পাসপোর্ট সংস্কার এবং দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নতুন আইনি উদ্যোগের বিষয়ে সংলাপে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, দেশের সর্বস্তরের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে সরকারের সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সামনে যে নতুন পাসপোর্টগুলো ইস্যু করা হবে, সেখানে আগের নিয়ম পুনর্বহাল করে ‘এক্সেপ্ট ইসরায়েল’ (Except Israel) শব্দগুচ্ছটি পুনরায় যুক্ত করা হবে। বিগত সরকারের আমলে জাতীয় বিষয়গুলোতে দলীয়করণ ও ব্যক্তিতান্ত্রিক চর্চার সমালোচনা করে তিনি বলেন, পাসপোর্টের নকশায় কিছু ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রদর্শনীবাদী চর্চা দেখা গেছে, যা দেশের প্রকৃত সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে না। সরকার সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে দেশের পাসপোর্ট ও ভিসার পাতায় জাতীয় স্মৃতিসৌধ, টাঙ্গুয়ার হাওর কিংবা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের মতো জাতীয় গৌরব ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণমুক্ত ও নৈর্ব্যক্তিকভাবে ফুটিয়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।
এছাড়া মুদ্রাবাজারে টাকার নোটে পরিবর্তনের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নতুন ব্যাংক নোটে দেশের বীরশ্রেষ্ঠদের ছবি ধারণ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে; তবে নোটের আর্থিক পরিবর্তন বা বাজার থেকে প্রত্যাহারের মতো খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সম্পূর্ণ অর্থ মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত হওয়ায় তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবে।
সবশেষে তরুণ সমাজকে সাইবার অপরাধ ও নৈতিক ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে সরকারের আইনি সংস্কারের পরিকল্পনার কথা জানান মন্ত্রী।
তিনি ঘোষণা দেন, অনলাইন ও অফলাইন জুয়া এবং বেটিং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পূর্ণ নতুন একটি আইন প্রণয়নের কাজ হাতে নিয়েছে, যা আগামী সংসদ অধিবেশনেই পাসের জন্য উত্থাপন করা হবে। ১৮৬৭ সালের মান্ধাতা আমলের পুরনো ও অকার্যকর জুয়া আইনটি পুরোপুরি বাতিল করে বর্তমান সময়ের ইন্টারনেটভিত্তিক অপরাধের আধুনিক উপাদান যুক্ত করে এই নতুন আইনটি সাজানো হচ্ছে। পাশাপাশি দেশে ঝুলে থাকা মাদক মামলার জট কমাতে এবং দ্রুত বিচারের স্বার্থে জেলাভিত্তিক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হচ্ছে। বর্তমানে শুধুমাত্র ঢাকাতেই প্রায় ৮০ হাজার এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বিপুল পরিমাণ মাদক মামলা ঝুলে থাকায় দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। মামলার সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এই বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলো গঠিত হলে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন হবে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভেদ দূরীকরণে পূর্বে ঘোষিত রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একটি সুশৃঙ্খল জাতি গঠনের লক্ষ্যে আমাদের ৩১ দফার মধ্যে এই কমিশনের প্রতিশ্রুতি ছিল এবং আমরা এখনও তা পালনে অবিচল। তবে এই মুহূর্তে সরকারের সামনে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের আরও অনেক জরুরি অগ্রাধিকার থাকায় এখনই এটি গঠন করা হচ্ছে না; সুবিধাজনক সময়ে এর পরিধি নির্ধারণ করে কমিশন গঠন করা হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








