News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:৫১, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

‘নির্বাচন ও গণভোটে নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’

‘নির্বাচন ও গণভোটে নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’

ছবি: সংগৃহীত

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এ উপলক্ষ্যে দেওয়া বিশেষ ভাষণে ভোটার ও প্রার্থীদের উদ্দেশে গভীর বক্তব্য প্রদান করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

ড. ইউনূস বলেন, আগামী নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে। 

তিনি প্রতিটি প্রার্থীকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য। নির্বাচনের পর সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে হবে।

ড. ইউনূস বলেন, আগামী পরশু দেশের নাগরিকরা দুইটি ভোট প্রদানের সুযোগ পাবেন। এক, নতুন সরকার গঠনের জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ। দুই, জুলাই জাতীয় সনদ সংক্রান্ত গণভোটে অংশগ্রহণ। 

তিনি স্মরণ করান, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে দাঁড়াতে পেরেছি।

প্রধান উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এবারের নির্বাচনের আগের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় শান্তিপূর্ণ ও সংযমী হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীল আচরণ করেছেন, ভোটাররা সচেতন থেকেছেন এবং সাধারণ মানুষ সংযম প্রদর্শন করেছেন। 

তবে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার চলাকালে সংঘটিত সহিংসতায় কিছু মূল্যবান প্রাণও হারানো গেছে, যা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।

ড. ইউনূস জানান, এবারের নির্বাচনে মোট ৫১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে এবং স্বতন্ত্রসহ প্রার্থীর সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি, যা দেশের নির্বাচনের ইতিহাসে সর্বাধিক। তিনি বলেন, এই নির্বাচন শুধু নিয়মিত নির্বাচন নয়; এটি একটি গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে জনগণের জাগরণ এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। ভোটের মাধ্যমে জনগণ দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।

তিনি বিশেষভাবে তরুণ ভোটার ও নারী ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, গত ১৭ বছর ধরে ভোটাধিকার থাকা সত্ত্বেও তারা ভোট দিতে পারেননি। দীর্ঘ সময়ের বঞ্চনা ও অবদমনের মধ্যেও তারা আশা ছাড়েনি। আন্দোলন, প্রতিবাদ ও স্বপ্নের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা লালন করেছেন। এ ভোট তাদের প্রথম সত্যিকারের রাজনৈতিক উচ্চারণ। নারীরাও মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সব গণআন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রধান উপদেষ্টা ভোটারদের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভয়কে পেছনে রেখে, সাহসকে সামনে এনে ভোটকেন্দ্রে যান। একটি ভোট শুধু সরকার নির্বাচন করবে না; এটি দীর্ঘ ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, জাতিকে নতুনভাবে গঠিত করবে এবং প্রমাণ করবে দেশের তরুণ, নারী ও সংগ্রামী জনগণের কণ্ঠ আর কখনও হারবে না।

আরও পড়ুন: প্রধান উপদেষ্টাসহ সকল উপদেষ্টার সম্পদের হিসাব প্রকাশ

নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার জন্য সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে। রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্বে থাকবেন, যাতে যেকোনো বিশৃঙ্খলা দ্রুত প্রতিহত করা যায়। প্রথমবারের মতো সারাদেশে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা ক্যামেরা ব্যবহার করবেন। ড্রোন ও ডগ স্কোয়াডের মাধ্যমে নিরাপত্তা নজরদারি নিশ্চিত করা হয়েছে।

ড. ইউনূস জানান, প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরাও ভোটাধিকার প্রয়োগে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। দেশে অবস্থানরত সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং কারাগারে থাকা যোগ্য নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সবাইকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি নির্দেশ দেন, কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সকল নেতা-কর্মীকে নির্দেশ দিতে হবে, যেন কেউ কোনো ধরনের সহিংসতা, ভয়ভীতি, ভোটে প্রভাব বিস্তার বা গুজব ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত না হয়। 

তিনি বলেন, ইতিহাস শিক্ষা দেয় ত্রুটিপূর্ণ বা সহিংস নির্বাচন দেশের জন্য কখনও কল্যাণ বয়ে আনে না।

নির্বাচনী প্রক্রিয়া চলাকালীন গুজব ও অপপ্রচার বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, দায়িত্বশীল থাকুন, যাচাই না করে তথ্য শেয়ার করবেন না। নির্বাচনের সঠিক তথ্যের জন্য ‘নির্বাচনবন্ধু হটলাইন ৩৩৩’-এ ফোন করতে হবে।

তিনি নিশ্চিত করেন, নির্বাচিত সরকার দ্রুত দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব শেষ হবে। জুলাই সনদ কোনো একক দলের ইশতেহার নয়; দীর্ঘ নয় মাস ধরে ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এটি প্রস্তুত করেছে। এই সনদ গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও দেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকনির্দেশনা নির্ধারণে একটি ঐতিহাসিক দলিল।

ড. ইউনূস বলেন, দেশের রূপান্তর সফল করতে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও মতামত অপরিহার্য। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সংস্কার ও দিশা নির্ধারণ করবে। ভোটের প্রভাব বহু প্রজন্মজুড়ে থাকবে। প্রতিটি ভোট আগামী দিনের রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তুলবে।

তিনি আহ্বান জানান, নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নিশ্চিত করুন। উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে দ্বিধাহীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন। এই নির্বাচনের দিনটি হোক নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়