আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৯:১৮, ১১ অক্টোবর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক হামলায় অন্তঃসত্ত্বা নারী ও দুই শিশুসহ নিহত ৯

যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক হামলায় অন্তঃসত্ত্বা নারী ও দুই শিশুসহ নিহত ৯

ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ইরি শহরে এক ভয়াবহ ও মর্মান্তিক বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এক ব্যক্তির অন্ধ ও নৃশংস গুলিবর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা এক নারী, দুই শিশুসহ মোট আটজন প্রাণ হারিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত ৪৫ বছর বয়সী বন্দুকধারী নিজের মাথায় গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। হামলাকারীকে নিয়ে পুরো ঘটনায় মোট প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ জনে।

শনিবার (১০ অক্টোবর) আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ইরি শহরের কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ বিভাগ এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার (০৯ অক্টোবর) স্থানীয় সময় বিকেল আনুমানিক ৪টা ৫২ মিনিটে ইরি শহরের পেরি স্ট্রিটের একটি আবাসিক এলাকায়।

ঘটনার শুরুতে বিচলিত ও আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় দুই নারীকে বাড়ির বাইরে বের হয়ে সাহায্য চাইতে দেখা যায়। তারা দৌড়াদৌড়ি করে প্রতিবেশীদের দরজায় কড়া নাড়ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে সশস্ত্র হামলাকারী বাড়িটি থেকে বের হয়ে আসে এবং বাইরে থাকা ওই দুই নারীকে লক্ষ্য করে পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি চালায়। গুলিতে ঘটনাস্থলেই দুই নারী লুটিয়ে পড়েন।

গোলাগুলির শব্দ ও জরুরি সংকেত পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ইরি শহর পুলিশ ও বিশেষ সোয়াত টিম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরো বাড়িটি ঘেরাও করলে ভেতরে থাকা হামলাকারীর সঙ্গে তাদের বন্দুকযুদ্ধ ও দীর্ঘক্ষণ থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিশেষ দল ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাড়ির ভেতরে প্রবেশের পর দ্বিতীয় তলায় অভিযুক্ত বন্দুকধারীর নিথর দেহ দেখতে পায়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়, সোয়াত টিমের অভিযানের মুখে পড়ে হামলাকারী নিজের আগ্নেয়াস্ত্র দিয়েই আত্মহত্যা করেছেন।

বাড়িটির ভেতরে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ মর্মান্তিক অবস্থার শিকার আরও সাতজনের মরদেহ উদ্ধার করে। নিহতদের মধ্যে রয়েছে ১ বছর বয়সী এক কন্যাসন্তান ও ৫ বছর বয়সী এক শিশু, একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী, আরও দুই নারী ও দুই তরুণ।

ইরি পুলিশ বিভাগের প্রধান রিক লোরাহ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, নিহত আটজনের মধ্যে সাতজনই হামলাকারীর নিজস্ব পরিবারের সদস্য এবং অপর একজন তাদের পারিবারিক বন্ধু। তদন্তকারীদের ধারণা, এটি পারিবারিক বিরোধ ও অভ্যন্তরীণ গোলযোগ থেকেই উদ্ভূত এক ভয়াবহ পারিবারিক হত্যাযজ্ঞ।

আরও পড়ুন: পানামায় ৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প

পুলিশ প্রধান রিক লোরাহ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, আমার ২৮ বছরের কর্মজীবনে এমন নারকীয় ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য আমি কখনো দেখিনি। ইরি শহর আগে কখনো এমন ভয়াবহ প্রাণহানি ও ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হয়েছে কি না তা আমার জানা নেই। ঘটনার কিছু দৃশ্য এমন থাকে, যা উদ্ধারকাজের পর বছরের পর বছর মস্তিষ্কে গেঁথে থাকে; এটি তেমনই এক মর্মান্তিক দৃশ্য।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, ৪৫ বছর বয়সী বন্দুকধারীর পূর্বে অপরাধের রেকর্ড থাকলেও তার পরিচয় এবং এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। নিহত নারীদের ব্যবহৃত সেলফোন ও পারিপার্শ্বিক তথ্য আলামত হিসেবে বাজেয়াপ্ত করে খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।

ঘটনার পর ইরি শহরের মেয়র ডারিয়া ডেভলিন পুলিশ ও জরুরি সেবার সদস্যদের পেশাদারিত্বের প্রশংসা করে নিহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।

পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জশ শাপিরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং ইরি শহর কর্তৃপক্ষকে অঙ্গরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরণের সহায়তার আশ্বাস দেন। গভর্নর শাপিরো দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অস্ত্র নিরাপত্তা নীতির পক্ষে সোচ্চার। ২০২৪ সালেও তিনি অঙ্গরাজ্য আইনসভায় ক্রেতাদের সর্বজনীন পটভূমি যাচাই এবং সিরিয়াল নম্বরহীন গোস্ট গান বা সনাক্তহীন অস্ত্র নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু মার্কিন আইনসভার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে সেই প্রস্তাবগুলো এখনো আটকে আছে।

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বিচার বন্দুক সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী গবেষণা সংস্থা গান ভায়োলেন্স আর্কাইভের তথ্য মতে:

গণ-হত্যাকাণ্ড: ২০২৬ সালের চলতি সময় পর্যন্ত দেশটিতে এটি ছিল অন্তত ১৯তম গণহত্যা (যেখানে হামলাকারী ছাড়া অন্তত চার বা তার চেয়ে বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন)।

গণ-গোলাগুলি: চলতি বছরের প্রথম দশ মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে ৫০০টিরও বেশি স্থানে গণ-গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।   
যুক্তরাষ্ট্রে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ সুবিধা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কোনো কঠোর আইন কার্যকর না হওয়ায় দিন দিন এই ধরণের পারিবারিক ট্র্যাজেডি ও গণ-হত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ইরি শহরের ঘটনাটি ফের মার্কিন কংগ্রেসে অস্ত্র আইন সংস্কারের জোর দাবি তুলে দিয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়