ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির হুঁশিয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রকে রেজায়ি
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ি। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান তীব্র সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে প্রাচীন পারস্যের গৌরবোজ্জ্বল সামরিক ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক অধ্যায় স্মরণ করিয়ে দিয়ে ওয়াশিংটনকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে তেহরান।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) সচিব ও জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, ইরানের হাতে মার্কিন ক্ষমতার পরাজয় ও অপমানের পুনরাবৃত্তি এড়াতে না পারার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সভ্যতার যুদ্ধ সংক্রান্ত বয়ানের জবাবে তিনি প্রাচীন সাসানীয় সম্রাট প্রথম শাপুরের কাছে রোমান সম্রাট ভ্যালেরিয়ানের লজ্জাজনক আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক ঘটনা তুলে ধরেছেন।
ইরানের সরকারি সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবি ও প্রেস টিভির বরাতে পার্সটুডে জানিয়েছে, সম্প্রতি এক কূটনৈতিক ও কৌশলগত বার্তায় মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এসব কড়া মন্তব্য করেন মোহসেন রেজায়ি।
ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি একটি বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি পশ্চিমা সভ্যতার মাহাত্ম্য তুলে ধরার পাশাপাশি ইরান ও দেশটির হাজার বছরের ঐতিহাসিক সভ্যতাকে লক্ষ্য করে অবমাননাকর ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মেজর জেনারেল রেজায়ি বলেন, ইরানের কাছে পরাজয় ও অপমানের পর যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা যখন এথেন্সে গিয়ে সভ্যতার সংঘাত বা সভ্যতার যুদ্ধ নিয়ে নতুন বয়ান তৈরির চেষ্টা করছেন, তখন তাদের ইতিহাসের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় পড়ে নেওয়া উচিত। সেই অধ্যায়ে স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে, কীভাবে প্রাচীন সাসানীয় সাম্রাজ্যের সম্রাট প্রথম শাপুরের সামনে তদানীন্তন রোমান সম্রাটকে নতজানু হতে হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সংঘাতমুখী নীতির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও যোগ করেন, যারা যেকোনো রাজনৈতিক ও সামরিক আলোচনায় ইতিহাস টেনে আনে, তাদের ইতিহাস পুনরাবৃত্তির জন্যও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রেজায়ির এই বক্তব্যে প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘটনা প্রতিফলিত হয়েছে। খ্রিষ্টীয় ২৪১ থেকে ২৭২ সাল পর্যন্ত পারস্যের মহান সাসানীয় সাম্রাজ্য শাসন করেন সম্রাট প্রথম শাপুর। তার শাসনামলে তিনি তৎকালীন পরাশক্তি রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে একাধিক সফল সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন এবং মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক ও আশপাশের অঞ্চল) থেকে শুরু করে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পারস্যের ভূরাজনৈতিক প্রভাব বহুগুণ বাড়িয়ে দেন।
আরও পড়ুন: মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা নয়: ট্রাম্প
ইতিহাসের পাতায় ২৬০ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান তুরস্কের এডেসা শহরের কাছে সংঘটিত যুদ্ধটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। সেই যুদ্ধে শাপুরের বাহিনীর কাছে রোমান সেনাদল শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। ওই যুদ্ধে পারস্যের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযান পরিচালনাকারী রোমান সম্রাট ভ্যালেরিয়ান বন্দি হন।
মানব ইতিহাসের নথিপত্র অনুযায়ী, ভ্যালেরিয়ানই ছিলেন কোনো বিদেশি শত্রুশক্তির হাতে বন্দি হওয়া প্রথম রোমান সম্রাট।
এই অবিস্মরণীয় সামরিক বিজয়কে চিরস্থায়ী ও উদযাপিত করতে সম্রাট শাপুর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে পাথরে খোদাই করা ভাস্কর্য নির্মাণ করিয়েছিলেন। বর্তমান ইরানের পার্সেপোলিসের নিকটবর্তী ঐতিহাসিক নাকশে রুস্তম-এর পাথুরে ভাস্কর্যে সম্রাট প্রথম শাপুরের ঘোড়ার সামনে বিজিত রোমান সম্রাট ভ্যালেরিয়ানের হাঁটু গেড়ে নতিস্বীকার ও আত্মসমর্পণের দৃশ্য উৎকীর্ণ রয়েছে। রেজায়ি ওয়াশিংটনকে মূলত এই ঐতিহাসিক সত্য স্মরণের মাধ্যমেই ইরানের আত্মরক্ষা ও সামরিক প্রতিঘাতের সক্ষমতার বার্তা দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সময়ে চলমান তীব্র রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং ওয়াশিংটন-তেহরান পাল্টাপাল্টি সামরিক হুমকির প্রেক্ষাপটেই রেজায়ির এই ঐতিহাসিক রূপক ব্যবহার। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা এবং সংঘাত শুরুর পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একের পর এক নজিরবিহীন হুমকি দিয়ে আসছেন।
গত ১ এপ্রিল ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানকে এমনভাবে ধ্বংস করবে যা দেশটিকে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। সেই সঙ্গে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেল শোধনাগার এবং মৌলিক অবকাঠামো ধূলিসাৎ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি। এর কিছুদিন পর, ৭ এপ্রিল ট্রাম্প আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে নতিস্বীকার না করে তবে “আজ রাতে এমন একটি পুরো সভ্যতা মুছে যাবে, যা আর কখনো ফিরিয়ে আনা যাবে না।” ট্রাম্পের এই সভ্যতাবিনাশী বক্তব্য বিশ্বজুড়ে তীব্র উদ্বেগ ও সমালোচনার জন্ম দেয়।
সামরিক যুদ্ধক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ও ঘোষিত কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর ওয়াশিংটন এখন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির প্রধান রাজনৈতিক ও অবকাঠামোগত কেন্দ্রে নতুন করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকিও জোরালো করেছেন মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা।
আন্তর্জাতিক সামরিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সভ্যতার ধ্বংস সংক্রান্ত মনস্তাত্ত্বিক বয়ানের বিপরীতে ইরান নিজেদের প্রাচীন পারসিয়ান ইতিহাসকে আত্মরক্ষার প্রতীক হিসেবে সামনে নিয়ে এসেছে।
এই বার্তার মাধ্যমে ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যেকোনো বহিরাগত আগ্রাসন বা সামরিক দুঃসাহসের কঠোর ও নজিরবিহীন জবাব দিতে তাদের সশস্ত্র বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








