রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ
ফাইল ছবি
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট এখন বাণিজ্যিক উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপের দিকে এগিয়ে চলেছে। প্রকল্পের সব গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এখন কেবল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়রা) চূড়ান্ত অনুমতির অপেক্ষা করা হচ্ছে। অনুমতি মিললেই ইতিহাসের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর তালিকায় ৩৩তম হিসেবে যুক্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ইউনিটের প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষ (এমসিআর) ও জরুরি নিয়ন্ত্রণকক্ষ (ইসিআর) থেকে যৌথভাবে পরিচালিত পরীক্ষাগুলোতে অভূতপূর্ব সাফল্য মিলেছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথম ধাপে ১৬ দশমিক ১ এমপিএ পরিচালন চাপ এবং ২৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রেখে ১২টি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়। পরবর্তী ধাপে ১৮ দশমিক ৬৫ এমপিএ উচ্চচাপের পরীক্ষায় শুরুতে কিছু ত্রুটি দেখা দিলে নির্মাণ সহযোগী দেশ রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ দল দ্রুত তা সমাধান করে। মস্কো থেকে আসা বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় সফলভাবে ভালভগুলোর কার্যকারিতা এবং অতিরিক্ত চাপ নির্গমন ক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে।
বায়রার অনুমোদন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রকল্পটি প্রবেশ করবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি বা ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ পর্বে। এ ধাপে চুল্লিতে একটি স্থিতিশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন বা পরমাণুর বিভাজন শুরু হবে। চুল্লিটিকে তার পূর্ণ নির্ধারিত তাপীয় ক্ষমতার ১ শতাংশেরও কম শক্তিস্তরে পরিচালনা করে রিঅ্যাক্টরের বিভিন্ন পরামিতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রাংশের কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এই ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে।
আরও পড়ুন: সাত মাসে ৩২ নতুন কূপে মিলছে ১৪৮ এমএমসিএফ গ্যাস
ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ সফলভাবে শেষ হওয়ার পর প্রকল্পটি পাওয়ার স্টার্ট-আপ বা ট্রায়াল অপারেশনাল লাইসেন্স পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এই ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়া নিয়ে জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। গ্রিডে যুক্ত হওয়ার আগে উৎপাদন ক্ষমতা প্রাথমিকভাবে ৩ শতাংশে এবং পরবর্তীতে ধাপে ধাপে তা বাড়িয়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। প্রাথমিক উৎপাদনে যাওয়ার পর টানা ৭ থেকে ৮ মাস পরীক্ষামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকতে পারে।
নিরাপদ বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই মহাযজ্ঞে অভ্যন্তরীণ কারিগরি সমন্বয়ের পাশাপাশি অফ-সাইট পর্যায়েও কঠোর নজরদারি বজায় রাখা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তদারকি। এছাড়া জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড-সংশ্লিষ্ট সংস্থা, সামরিক বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং নিউক্লিয়ার ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট সংস্থাসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে মূল ঠিকাদারি চুক্তির আর্থিক কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের ব্যয় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে এই মেগা প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। এছাড়া প্রথম দফার নির্ধারিত মেয়াদ পেরিয়ে দুই দফায় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে, তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রথম ইউনিটের উৎপাদন প্রক্রিয়া সফলভাবে জাতীয় পর্যায়ে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন দেশি-বিদেশি প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








