নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:৫০, ৬ অক্টোবর ২০২৬
আপডেট: ২০:৫৩, ৬ অক্টোবর ২০২৬

মহাকাশ বর্জ্যের ধাক্কা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১

মহাকাশ বর্জ্যের ধাক্কা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১

ছবি: সংগৃহীত

অল্পের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছে বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (বিএস-১)। গত ২৩ আগস্ট দ্রুতগতির একটি মহাকাশ বর্জ্য (স্পেস ডেব্রিস) উপগ্রহটির অত্যন্ত কাছে চলে এলে শেষ মুহূর্তে কক্ষপথ সামান্য পরিবর্তন করে সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়াতে সক্ষম হন বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) প্রকৌশলীরা। নাসার স্পেস ট্র্যাকার থেকে পাওয়া সতর্কবার্তা অনুযায়ী, ওই মহাকাশ বর্জ্যটি বিএস-১-এর মাত্র ৮৫২ মিটারের মধ্যে চলে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সংঘর্ষ হলে উপগ্রহটির বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে নাসা থেকে বিএসসিএলের প্রকৌশলীদের কাছে জরুরি সতর্কবার্তা আসে। এতে জানানো হয়, দ্রুতগতির একটি মহাকাশ বর্জ্য পরবর্তী ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে বিএস-১-এর অত্যন্ত কাছে চলে আসতে পারে। 

নাসার স্পেস ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্জ্যটির সঙ্গে বিএস-১-এর সম্ভাব্য ন্যূনতম দূরত্ব ছিল মাত্র ৮৫২ মিটার। পরিস্থিতিকে গুরুতর হিসেবে উল্লেখ করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, নাসা প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর বিএস-১-এর নিরাপত্তাসংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য বিএসসিএলকে দিয়ে থাকে। তবে ওই দিনের সর্বশেষ বার্তাটি ছিল আর্জেন্ট বা জরুরি সতর্কতামূলক।

বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান গত ৫ অক্টোবর দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরিস্থিতিটি ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন এবং হাতে সময়ও ছিল খুব কম। মহাকাশ বর্জ্যের সম্ভাব্য আঘাত এড়াতে বিএস-১-এর অবস্থান পরিবর্তন করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। মাত্র ৮৫২ মিটার দূরত্বে চলে আসার বিষয়টিকে তিনি এনিওয়ানস গেম বা জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করেন। গাজীপুরে বিএসসিএলের গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়াররা শেষ মুহূর্তে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে উপগ্রহটির কক্ষপথে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনেন।

তিনি জানান, বিএস-১-কে সামনে-পেছনে কিংবা ডান দিকে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। বাঁ দিকে সরালে সেটি আরেকটি সক্রিয় স্যাটেলাইটের কাছাকাছি চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করত। ফলে ওই মুহূর্তে উপগ্রহটির গতিপথ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এর মধ্যেই সময় যত গড়াচ্ছিল, মহাকাশ বর্জ্যটি বিএস-১-এর আরও কাছে চলে আসছিল। শেষ পর্যন্ত প্রকৌশলীরা উপগ্রহটিকে সামান্য বাঁ দিকে সরিয়ে দেন এবং বর্জ্যটি নিরাপদে অতিক্রম করা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। আতঙ্ক ও উত্তেজনাপূর্ণ সেই পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত মহাকাশ বর্জ্যটি বিএস-১-কে অতিক্রম করে চলে যায়। বিপদ কেটে যাওয়ার পর উপগ্রহটিকে আবার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

ড. মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান বলেন, এই ঘটনা স্যাটেলাইট পরিচালনার মতো উচ্চপ্রযুক্তি ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি ব্যবস্থাপনায় বিএসসিএলের নিজস্ব জনবলের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে। তিনি জানান, প্রতিটি স্যাটেলাইটকে নির্দিষ্ট একটি অরবিটাল স্লটে কক্ষপথে স্থাপন করা হয় এবং এর সঙ্গে গ্রাউন্ড স্টেশন ও টেরিটরির সমন্বয় থাকে। নাসার স্পেস ট্র্যাকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্যাটেলাইটের অবস্থান, নিরাপত্তা, সংস্করণ এবং মহাকাশ বর্জ্যের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। স্যাটেলাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ নাসার এ ধরনের সেবা গ্রহণের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।

আরও পড়ুন: ডেটা সেন্টারের জন্য ৩০০ হেক্টরের বেশি বন উজাড়, তদন্তে গুগল

বিএসসিএলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নাসার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, বিএস-১-এর দিকে ধেয়ে আসা মহাকাশ বর্জ্যটি ভারতের ইনস্যাট-১এ স্যাটেলাইটের অংশ। ভারত ১৯৮২ সালের ১০ এপ্রিল স্যাটেলাইটটি মহাকাশে উৎক্ষেপণ করে। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটি ও জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে উৎক্ষেপণের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায়, ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮২ সালে এটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। এরপর আর্থ স্টেশনের সঙ্গে এর যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের বহু স্যাটেলাইট মহাকাশে হারিয়ে যাওয়ার পর সেগুলোর বিভিন্ন অংশ এখন মহাকাশ বর্জ্য হিসেবে কক্ষপথে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মহাকাশ বর্জ্য বলতে সাধারণত মহাকাশে পরিত্যক্ত বা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়া স্যাটেলাইট, রকেটের অংশ এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ভগ্নাংশকে বোঝায়। এসব বর্জ্য অত্যন্ত উচ্চগতিতে পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরে বেড়ায়। মহাকাশে বিভিন্ন ধরনের বলের ভারসাম্যের কারণে ছোট-বড় অসংখ্য বর্জ্য দীর্ঘ সময় ধরে কক্ষপথে অবস্থান করতে পারে। সক্রিয় কোনো স্যাটেলাইটের সঙ্গে এসব বর্জ্যের সংঘর্ষ হলে সেটি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ২০১৮ সালের মে মাসে মহাকাশে নিজস্ব প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে। বাংলাদেশ সময় ১২ মে রাত ২টা ১৪ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ ব্লক ৫ রকেটের মাধ্যমে বিএস-১-এর উৎক্ষেপণ করা হয়। বর্তমানে উপগ্রহটি ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে ভূস্থির কক্ষপথে অবস্থান করছে। ফ্রান্সের মহাকাশ সংস্থা থালেস অ্যালেনিয়া স্পেস এটি নির্মাণ করে। নির্মাণ ও উৎক্ষেপণ মিলিয়ে প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। স্যাটেলাইটটির নির্ধারিত কার্যকাল প্রায় ১৫ থেকে ১৮ বছর।

বিএস-১ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব কৃত্রিম উপগ্রহের অধিকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হয়। এর মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এদিকে, বিএসসিএলের মহাব্যবস্থাপক (বিক্রয় ও বিপণন) শাহ আহমেদুল কবির এই ঘটনাকে প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীদের সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। 

তার দাবি, দক্ষতার সঙ্গে উপগ্রহ পরিচালনা ও সংকট মোকাবিলার ফলে বিএস-১-এর জ্বালানি সাশ্রয় হয়েছে। ফলে বিদ্যমান জ্বালানি ব্যবহার করেই উপগ্রহটির কার্যক্রম আরও ১৭ মাস চালানো সম্ভব হবে। তাঁর ভাষায়, বিএসসিএলের নিজস্ব দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণেই বিএস-১-এর লাইফ এক্সপেকটেন্সি বা কার্যক্ষমতার মেয়াদ ১৭ মাস বেড়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়