নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২১:২৭, ৬ অক্টোবর ২০২৬

এশিয়ার বাজারে বাড়ছে বাংলাদেশের রপ্তানি

এশিয়ার বাজারে বাড়ছে বাংলাদেশের রপ্তানি

ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতার বাইরে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার ধীরে ধীরে এশিয়ার দিকে বিস্তৃত হচ্ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এশীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে। একই সময়ে জাপানের বাজারেও রপ্তানি সামান্য ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। 

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে ২২ কোটি ৫৪ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে চীনে রপ্তানি হয়েছিল ২০ কোটি ৬১ লাখ ৮০ হাজার ডলারের পণ্য। দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি ৭ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৩ কোটি ৪৫ লাখ ৫০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১২ কোটি ৫৪ লাখ ১০ হাজার ডলার। প্রতিবেশী ভারতের বাজারে রপ্তানি ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেড়ে ৫১ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে; ২০২৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বরে যার পরিমাণ ছিল ৪৮ কোটি ৩৭ লাখ ১০ হাজার ডলার। আর জাপানে রপ্তানি হয়েছে ৩৯ কোটি ৯১ লাখ ১০ হাজার ডলারের পণ্য, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩৯ কোটি ৬১ লাখ ১০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এশিয়ার চারটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারেই বাংলাদেশের রপ্তানি অন্তত স্থিতিশীল রয়েছে, আর চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবৃদ্ধি বাজার বহুমুখীকরণের সম্ভাবনাকে বিশেষভাবে সামনে এনেছে।

এই প্রবৃদ্ধি এসেছে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়েও ইতিবাচক গতি ফেরার সময়ে। 

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৩০৯ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ২৩১ কোটি ৩১ লাখ ৭০ হাজার ডলার। ফলে এক বছরে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাসেই রপ্তানি আয় ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেড়ে ৩৯৩ কোটি ৭২ লাখ ৩০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে; আগের বছরের সেপ্টেম্বরে আয় হয়েছিল ৩৬২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। জুলাইয়ে সামান্য শ্লথতার পর আগস্টে রপ্তানি ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বরে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ বাড়ায় প্রথম প্রান্তিকে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি শক্ত অবস্থানে এসেছে।

রপ্তানি আয়ের এই পুনরুদ্ধারের মূল চালিকাশক্তি এখনো তৈরি পোশাক খাত। জুলাই-সেপ্টেম্বরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৫৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে নিটওয়্যার রপ্তানি ৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়ে ৫৯৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার এবং ওভেন পোশাক ৫ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়ে ৪৬১ কোটি ৪০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। তবে শুধু পোশাকনির্ভর প্রবৃদ্ধি নয়, একই সময়ে বেশ কিছু অপ্রচলিত ও অপ্রধান পণ্য খাতও শক্তিশালী পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে ৪০ দশমিক ৩৯ শতাংশ, পাট ও পাটজাত পণ্য ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ, হালকা প্রকৌশল পণ্য ১৬ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং হোম টেক্সটাইল ১১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে একক মাসেও ওষুধ, পাট, চামড়া ও হোম টেক্সটাইলসহ কয়েকটি খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। বিপরীতে কৃষিপণ্য এবং হিমায়িত ও জীবন্ত মাছের রপ্তানি প্রথম প্রান্তিকে কমেছে।

এশিয়ার বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এটি শুধু একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং বাংলাদেশের জন্য বড় ও বৈচিত্র্যময় ভোক্তা বাজারগুলোর দরজা আরও খোলার সম্ভাবনা তৈরি করছে। চীনের মতো বিশাল বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো সামগ্রিক সম্ভাবনার তুলনায় ছোট হলেও সেখানে নতুন পণ্য প্রবেশ করানোর সুযোগ রয়েছে। এ বছরের জুনে কুনমিংয়ে অনুষ্ঠিত ১০ম চায়না-সাউথ এশিয়া এক্সপো ও ৩০তম চায়না কুনমিং ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট ফেয়ারে বাংলাদেশ থিম কান্ট্রি হিসেবে অংশ নেয়। ইপিবি ও বাংলাদেশি ব্যবসায়িক সংগঠনের উদ্যোগে শতাধিক বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কান্ট্রি প্যাভিলিয়নে পণ্য প্রদর্শন করে। ২৩ সদস্যের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলও মেলায় অংশ নেয় এবং বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়। এসব আয়োজনকে শুধু প্রদর্শনী নয়, সম্ভাব্য ক্রেতা খোঁজা, বাজারের চাহিদা বোঝা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরির একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: অক্টোবরের প্রথম ৫ দিনেই প্রবাসী আয় ৫১৩ মিলিয়ন ডলার

চীনের বাজারে পণ্য বহুমুখীকরণের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ইপিবি। সংস্থাটির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফের মতে, চীনের বিশাল ভোক্তা বাজার ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা বাংলাদেশের জন্য নতুন পণ্য নিয়ে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করছে। একইভাবে ভারতের ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা বড়। ভৌগোলিক নৈকট্য, বিশাল জনসংখ্যা ও তুলনামূলক কম পরিবহন দূরত্বের কারণে ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ আরও বাড়ানো গেলে রপ্তানি ব্যয় ও সরবরাহের সময় দুই ক্ষেত্রেই সুবিধা পাওয়া সম্ভব। 

ইপিবির দেশভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেড়ে ৩৩ কোটি ৫২ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছিল, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩১ কোটি ১৩ লাখ ডলার। তবে ভারতের ক্ষেত্রে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।

ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধির সম্ভাবনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে দুই দেশের মোট বাণিজ্যের কাঠামো বিবেচনায় নিলে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে প্রায় ১৭৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল, যা আগের অর্থবছরের প্রায় ১৭৬ কোটি ডলারের কাছাকাছি। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্যে বাংলাদেশের ঘাটতি এখনো বড়। এই বাস্তবতায় ভারতীয় বাজারে শুধু তৈরি পোশাক নয়, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, পাটজাত পণ্য, খাদ্য ও কৃষিপণ্য, ওষুধ, হোম টেক্সটাইল এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি সীমান্ত অবকাঠামো, কাস্টমস প্রক্রিয়া, মাননিয়ন্ত্রণ এবং শুল্ক-অশুল্ক বাধা কমানো এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে।

দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানও বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে উঠে আসছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, জুতা, পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, ওষুধ এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। জাপানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সম্ভাবনার পাশাপাশি হালকা প্রকৌশল পণ্য এবং অন্যান্য মূল্যসংযোজিত পণ্য নিয়ে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া ও মেক্সিকোর মতো অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের উপস্থিতিও বাড়ছে। 

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে অপ্রচলিত বাজারগুলোতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৬৪ কোটি ২৯ লাখ ডলারে পৌঁছে মাসিক রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এসব বাজারে পোশাক রপ্তানির মাসিক গড় দাঁড়িয়েছে ৬১ কোটি ১৬ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের মাসিক গড় ৫৭ কোটি ৪৪ লাখ ডলারের চেয়ে বেশি।

তবে এশিয়ার বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির বর্তমান প্রবণতাকে স্থায়ী ও বড় আকারের বাজার সম্প্রসারণে রূপ দিতে হলে শুধু রপ্তানি বাড়ার পরিসংখ্যান যথেষ্ট নয়। পণ্যের মান, সংশ্লিষ্ট দেশের বাধ্যতামূলক মান ও নিরাপত্তা বিধি, প্যাকেজিং, সার্টিফিকেশন, পরিবেশগত ও শ্রমমান, সময়মতো সরবরাহ এবং ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উন্নয়ন সবকিছুর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য বাস্তবতায় শুল্কসুবিধা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য প্রতিযোগিতা আরও বাড়াবে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামোয় পণ্য ও বাজার উভয় ক্ষেত্রেই উচ্চ মাত্রার কেন্দ্রীভবনের বিষয়টি উঠে এসেছে; দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক মোট পণ্য রপ্তানির বড় অংশ দখল করে আছে। ফলে নতুন বাজারের পাশাপাশি নতুন পণ্য তৈরি করাও রপ্তানি কৌশলের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠছে।

এই বাস্তবতায় ইপিবি বাণিজ্য মেলা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল, বাজার অনুসন্ধান, ক্রেতা-বিক্রেতা বৈঠক এবং প্রচারমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে রপ্তানিকারকদের সহায়তা বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক মেলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতেও সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশ নেওয়া ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বুথ ভাড়া মওকুফের উদ্যোগের কথা জানান, যাতে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়। এর ফলে বাজার বহুমুখীকরণের প্রক্রিয়ায় বড় রপ্তানিকারকদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানকেও যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের রপ্তানি পরিসংখ্যান বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে একটি দ্বিমুখী চিত্র তুলে ধরছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এখনো প্রধান বাজার হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে জুলাই-সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র একাই বাংলাদেশি পণ্য আমদানি করেছে ২৫৯ কোটি ১০ লাখ ডলারের, আর যুক্তরাজ্য ও জার্মানি ছিল পরবর্তী বড় বাজার। অন্যদিকে ভারত, জাপান, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় বাজারে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি নতুন ভারসাম্যের সম্ভাবনা তৈরি করছে। একই সময়ে তুরস্কের মতো উদীয়মান বাজারেও প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু মোট রপ্তানি আয় বাড়ানো নয়; বরং কোন বাজারে কোন পণ্য, কী মানে এবং কী প্রতিযোগিতামূলক শর্তে পাঠানো হবে সেই কৌশল নির্ধারণ করা। এশিয়ার বড় ভোক্তা বাজারগুলোতে বর্তমান প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক, পণ্য বৈচিত্র্য এবং মূল্যসংযোজনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে রপ্তানি নির্ভরতার কাঠামোয় আরও ভারসাম্য আনার সুযোগ তৈরি হবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়