৭৫ বছরে না ফেরার দেশে কিংবদন্তি অভিনেতা নানা পাটেকর
ছবি: সংগৃহীত
বিনোদন দুনিয়ায় নেমে এল এক গভীর শোকের ছায়া। নিজস্ব সংলাপ বলার ক্ষুরধার ভঙ্গি, ব্যতিক্রমী অভিনয়শৈলী এবং পর্দায় অনন্য উপস্থিতির জন্য কোটি দর্শকের হৃদয়ে রাজত্ব করা প্রবীণ অভিনেতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা নানা পাটেকর পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে গোয়ায় নিজ বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) হয়ে চিরবিদায় নিয়েছেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও বার্তা সংস্থা এএনআই সূত্রে জানা যায়, গোয়ার ডোনা পাউলায় নিজ বাসভবনে সকালে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় এই প্রবীণ অভিনেতাকে। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিনেতার ছেলে মালহার পাটেকর তাঁর মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন। দ্রুত তাঁকে স্থানীয় মণিপাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়, স্থানীয় সময় ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর অনকোলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক শেখর সালকারসহ অন্যান্য চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাঁকে বাঁচিয়ে তোলার অক্লান্ত চেষ্টা চালান। তাঁকে ক্রমাগত সিপিআর দেওয়া হলেও তাঁর শরীর থেকে কোনো সাড়া মেলেনি।
এদিকে, এই আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় একটি মেডিকো-লিগ্যাল কেস নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত করতে তাঁর মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। গোয়া থেকে তাঁর মরদেহ মুম্বইতে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবন ও চলচ্চিত্র যাত্রা১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার মুরুদ-জাঞ্জিরায় এক মারাঠি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নানা পাটেকর। তাঁর মূল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। ১৯৭৮ সালে মুজফফর আলির গমন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি প্রথম রূপোলি পর্দায় পা রাখেন। ১৯৮৮ সালে অস্কারে মনোনীত সালাম বোম্বে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর, ১৯৮৯ সালে অপরাধভিত্তিক নাট্যধর্মী সিনেমা পরিন্দাতে দারুণ পারফর্ম্যান্সের জন্য তিনি সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন।
আরও পড়ুন: চলে গেলেন কিংবদন্তি নির্মাতা সিঙ্গীতম শ্রীনিবাস রাও
তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনে পরিন্দা, ক্রান্তিবীর, অগ্নিসাক্ষী, অঙ্গার, খামোশি দ্য মিউজিক্যাল, ওয়াজুদ, যশবন্ত, আব তক ছাপ্পান, অপহরণ, ট্যাক্সি নং–৯২১১ এবং রাজনীতির মতো একাধিক ব্যবসাসফল ও প্রশংসিত সিনেমা রয়েছে। ২০০৭ সালে কমেডি ছবি ওয়েলকাম এবং এর সিক্যুয়েল ওয়েলকাম ব্যাক-এ গ্যাংস্টার উদয় শেঠি চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নতুন প্রজন্মের দর্শকদেরও দারুণ বিনোদন দেন। ২০১৬ সালে মারাঠি ভাষার আলোচিত চলচ্চিত্র নাটসম্রাট-এ একজন অবসরপ্রাপ্ত থিয়েটার অভিনেতার চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি কমেডি থ্রিলার হাউসফুল ৫ এবং বৈজ্ঞানিক ড্রামা দ্য ভ্যাকসিন ওয়ার-এর মতো সিনেমাতেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি মাধুরী দীক্ষিত অভিনীত প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক সিনেমাটি পরিচালনা করেছিলেন এবং যশবন্ত, ওয়াজুদ-এর মতো ছবিতে নেপথ্য গায়ক হিসেবেও গান গেয়েছিলেন।
অসাধারণ স্বীকৃতি ও সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সংযোগভারতীয় সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী ও বাস্তবধর্মী অভিনেতা হিসেবে নানা পাটেকর সবসময়ই সমাদৃত হয়েছেন। অভিনয় জীবনে তিনি মোট তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, চারটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, দুটি মহারাষ্ট্র রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং একটি ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস মারাঠি লাভ করেন। চলচ্চিত্র ও শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের অন্যতম সম্মানজনক বেসামরিক খেতাব পদ্মশ্রীতে ভূষিত করে।
সিনেমা জগতের বাইরেও বাস্তব জীবনে নানা পাটেকর দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। নিজের পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র প্রহার-এর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি ১৯৮৮ সালে টেরিটোরিয়াল আর্মিতে (আঞ্চলিক সেনাবাহিনী) ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগ দেন এবং দীর্ঘ তিন বছরের কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। যেখানে তিনি তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ভি কে সিংয়ের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। এখানেই তাঁর সামরিক যাত্রা শেষ হয়নি; ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের সময় তিনি মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রির সঙ্গে মেজর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে তিনি টেরিটোরিয়াল আর্মি থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদায় অবসর গ্রহণ করেন।
নানা পাটেকরের প্রয়াণে ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো। তাঁর বলিষ্ঠ সংলাপ, অনন্য অভিব্যক্তি এবং সাধারণ জীবনযাপন তাঁকে চিরকাল দর্শকের হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








