নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২১:১৭, ৭ অক্টোবর ২০২৬

অটোরিকশায় বল পড়াকে কেন্দ্র করে ৫ গ্রামের সংঘর্ষ, আহত ২৫

অটোরিকশায় বল পড়াকে কেন্দ্র করে ৫ গ্রামের সংঘর্ষ, আহত ২৫

ছবি: সংগৃহীত

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে শিশুদের ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে তুচ্ছ একটি ঘটনাকে ঘিরে সৃষ্ট বিরোধ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে সংঘবদ্ধ হয়ে পাঁচ গ্রামের বাসিন্দারা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছেন। 

বুধবার (০৭ অক্টোবর) দুপুরে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী চলা এই সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এ সময় বেশ কয়েকটি দোকানপাট ভাঙচুর, লুটপাট ও একটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ আগে বীরজয়-লক্ষ্মী-ধুতমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে শিশুরা ক্রিকেট খেলার সময় একটি বল স্থানীয় মধ্য তাহিরপুর গ্রামের জালাল মিয়ার একটি অটোরিকশায় গিয়ে পড়ে। এতে অটোরিকশার কাচ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অটোরিকশার মালিক মধ্য তাহিরপুর গ্রামের হওয়ায় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে খেলোয়াড় শিশুদের মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

এই ঘটনার জেরে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের হাফিজ মিয়ার সঙ্গে খেলোয়াড়দের কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। পরবর্তীতে তাহিরপুর বাজারে ধুতমা গ্রামের জসিম উদ্দিনকে মধ্য তাহিরপুরের কয়েকজন মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এর পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়ায় অপর পক্ষের লোকজনও হাফিজ মিয়াকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে মারধর করেন। ধাপে ধাপে এই বিরোধ পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়।

পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে মঙ্গলবার (০৬ অক্টোবর) রাতে বীরনগর গ্রামের একটি মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে গ্রামবাসীকে সংঘবদ্ধ ও মারামারিতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। এই মাইকিংয়ের পর থেকেই এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, বুধবার সকালে বীরনগর, জয়নগর, লক্ষ্মীপুর ও ধুতমা এই চার গ্রামের শত শত মানুষ একত্রিত হয়ে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের দিকে এগিয়ে যান। অন্যদিকে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের লোকজনও ফায়ার সার্ভিসসংলগ্ন সড়ক এলাকায় অবস্থান নেন। দুপুর ১২টার দিকে তাহিরপুর সহকারী পুলিশ সুপার ও পুলিশ সার্কেল কার্যালয়ের সামনে, তাহিরপুর-সুনামগঞ্জ সড়ক এবং শনির হাওর এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলা এই সংঘর্ষে তাহিরপুর-সুনামগঞ্জ সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

সংঘর্ষ চলাকালে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের বেশ কিছু দোকানপাটে হামলা চালানো হয়। স্থানীয় দোকানদার ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, হামলাকারীরা দোকান ভাঙচুর করে নগদ অর্থসহ মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এ সময় একটি বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। আকস্মিক এই হামলায় নারী ও শিশুরাও মারাত্মকভাবে আতঙ্কিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হন।

আরও পড়ুন: লালমনিরহাটে স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যার দায় স্বামী আতিকুলের মৃত্যুদণ্ড

সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এর মধ্যে গুরুতর আহত অবস্থায় বীরনগর গ্রামের মাইনুদ্দিন (৩৫), আশিষ মিয়া (৪০), রেজাউল (৩৫) এবং খোকন মিয়াকে (৩৬) উন্নত চিকিৎসার জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বাকিদের তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সংঘর্ষের শুরুতেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উভয় পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও অতিরিক্ত উত্তেজনার কারণে তা ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রের বাইরে চলে যাওয়ায় পুলিশ বাধ্য হয়ে বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। পুলিশ এবং স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের যৌথ হস্তক্ষেপে দুপুর ২টার দিকে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে জয়নগর গ্রামের বাসিন্দা, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও তাহিরপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুনাব আলী বলেন, তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে সামান্য মারামারি থেকে এই বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় আমরা অত্যন্ত লজ্জিত। সংসদ সদস্য ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের এলাকা হওয়া সত্ত্বেও আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারিনি। উভয় পক্ষের কিছু অতিউৎসাহী মানুষের জন্যই এটি ঘটেছে।

মধ্য তাহিরপুর গ্রামের তানিম আহমদ লিংকন ও খাদিজা বেগমসহ স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহমদ জানান, মসজিদে মাইকিং করার পর থেকেই পুলিশ সতর্ক অবস্থানে ছিল এবং ঘটনার সময়ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হয়েছে। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে। তবে নতুন করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা সংঘাত এড়াতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়