নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:৫৬, ৭ অক্টোবর ২০২৬
আপডেট: ২০:১০, ৭ অক্টোবর ২০২৬

মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী, কমেছে মানুষের প্রকৃত আয়

মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী, কমেছে মানুষের প্রকৃত আয়

ফাইল ছবি

দেশে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে মূল্যস্ফীতি। টানা দুই মাস কমার পর সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগস্টে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে শূন্য দশমিক ০৮ শতাংশীয় পয়েন্ট। একই সময়ে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়েছে আরও বেশি হারে। এর বিপরীতে সাধারণ মানুষের আয় বা মজুরি বৃদ্ধির গতি কমেছে, ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে গিয়ে সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আরও চাপে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বুধবার (০৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সেপ্টেম্বর মাসের ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) ও মজুরি হার সূচকের (ডাব্লিউআরআই) সর্বশেষ তথ্য প্রকাশ করে। 

বিবিএসের হিসাবে, সেপ্টেম্বরে জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ হয়েছে, যা আগস্টে ছিল ৭ দশমিক ০২ শতাংশ। এক মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে শূন্য দশমিক ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে নেমেছে, আগস্টে যা ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।

সাম্প্রতিক কয়েক মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে মূল্যস্ফীতির গতিপথেও পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্ট হয়। চলতি বছরের মে মাসে জাতীয় মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উঠেছিল, যা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। জুনে তা কিছুটা কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে দাঁড়ায়। এরপর জুলাইয়ে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং আগস্টে আরও কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ হয়। ফলে টানা দুই মাস কমার পর সেপ্টেম্বরে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হলো মূল্যস্ফীতি।

সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতিতে খাদ্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। তবে এক বছর আগের সেপ্টেম্বরের সঙ্গে তুলনা করলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবার কম। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ। বিপরীতে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি গত বছরের ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ থেকে বেড়ে এবার ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ খাদ্যপণ্যে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে মূল্যচাপ আগের বছরের তুলনায় বেশি রয়েছে।

গ্রাম ও শহরের মূল্যচিত্রেও কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে গ্রামীণ এলাকায় সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ হয়েছে, আগস্টে যা ছিল ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ০১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ হয়েছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে নেমেছে, আগস্টে যা ছিল ৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ। 

অন্যদিকে শহর এলাকায় সাধারণ মূল্যস্ফীতি আগস্টের ৮ দশমিক ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বরে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ হয়েছে। শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ হলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ হয়েছে।

মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বগতির বিপরীতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো মজুরি বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া। বিবিএসের মজুরি হার সূচক অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ মজুরি বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ, আগস্টে যা ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার কমেছে শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশীয় পয়েন্ট। একই সময়ে কৃষি, শিল্প ও সেবা তিন প্রধান খাতেই মজুরি বৃদ্ধির হার কমেছে।

আরও পড়ুন: ব্যাংক ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে পে-স্কেল কার্যকরের নির্দেশ

সেপ্টেম্বরে কৃষি খাতে মজুরি বৃদ্ধির হার হয়েছে ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, আগস্টে যা ছিল ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ। শিল্প খাতে মজুরি বৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। সেবা খাতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে আগস্টের ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে সেপ্টেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ। ফলে শুধু একটি খাত নয়, অর্থনীতির প্রধান তিন খাতেই শ্রমজীবী মানুষের আয় বৃদ্ধির গতি মন্থর হয়েছে।

এর অর্থ দাঁড়ায়, সেপ্টেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ হলেও জাতীয় গড় মজুরি বেড়েছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ হারে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। সরল হিসাবে, মজুরি ও মূল্যস্তরের এই ব্যবধান মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের আয়ের বড় অংশ খাবার, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় হয়, তাদের জন্য এ চাপ তুলনামূলক বেশি।

সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতির সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ায়। নতুন দরে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা করা হয়।

জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি সেপ্টেম্বরের একেবারে শেষভাগে কার্যকর হওয়ায় এর পূর্ণ প্রভাব এক মাসের মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ সীমিত ছিল। তবে পরিবহন, কৃষি, উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ ব্যয়ের মাধ্যমে এর প্রভাব পরবর্তী মাসগুলোতে আরও দৃশ্যমান হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ডিজেল বাংলাদেশের পণ্য পরিবহন, গণপরিবহন ও সেচব্যবস্থায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় এর দাম বাড়লে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। ব্র্যাক ইপিএল-এর এক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষের প্রকৃত ব্যয়যোগ্য আয় ও সামগ্রিক ভোগে চাপ ফেলতে পারে।

জ্বালানি তেলের নতুন দাম শুধু ভোক্তার সরাসরি জ্বালানি ব্যয়ই বাড়ায় না; পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার খরচও বাড়াতে পারে। ফলে কৃষিপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ, আন্তজেলা পণ্য পরিবহন, গণপরিবহন এবং শিল্পকারখানার লজিস্টিক ব্যয়ে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্য মূল্যস্ফীতিরও বাড়তি প্রবণতা দেখা যাওয়ায় সামনে বাজারদরের ওপর এই ব্যয়ের চাপ কতটা পড়ে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে মূল্যস্ফীতির সামগ্রিক হার এখনও গত বছরের একই সময়ের কাছাকাছি রয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সে হিসাবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি সামান্য কম হলেও নিত্যপণ্যের দাম যে আগের বছরের তুলনায় কমে গেছে, এমন অর্থ করা যায় না। কারণ মূল্যস্ফীতি হলো দাম বাড়ার হার; একবার পণ্যের দাম বেড়ে গেলে পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও দাম আগের উচ্চ স্তরেই থাকতে পারে। এ কারণেই আগস্টে মূল্যস্ফীতি কমার পরও সাধারণ মানুষের বাজারে স্বস্তি না পাওয়ার বিষয়টি অর্থনীতিবিদদের আলোচনায় এসেছে।

আগস্টের মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নামার সময়ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে ছিল। তখন অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছিলেন, মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে কমার পাশাপাশি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি এবং মানুষের আয় বৃদ্ধির গতি না বাড়লে বাজারে স্বস্তি ফিরবে না। কারণ উচ্চ মূল্যস্তরের ওপর নতুন করে মূল্যস্ফীতি যোগ হতে থাকলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আগের অবস্থায় ফিরতে সময় লাগে।

এদিকে সেপ্টেম্বরে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৯০ শতাংশে নেমে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি ও আয়ের ব্যবধান আবারও সামনে এসেছে। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক ও দৈনিকভিত্তিক শ্রমবাজারে যাদের আয় দ্রুত মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় হয় না, তাদের জন্য খাদ্য, বাসস্থান, যাতায়াত ও অন্যান্য মৌলিক ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। মজুরি বৃদ্ধির গতি যদি দীর্ঘ সময় মূল্যস্ফীতির নিচে থাকে, তাহলে নামমাত্র আয় বাড়লেও প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

তবে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে নবম জাতীয় বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে এবং নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় মূল বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর ব্যবস্থা রয়েছে এবং ধাপে ধাপে এর বাস্তবায়ন হচ্ছে। ফলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন সমন্বয় জাতীয় মজুরি সূচকের সামগ্রিক চিত্রের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা যায় না; কারণ বিবিএসের মজুরি হার সূচক মূলত বিভিন্ন শ্রমবাজারের মজুরি পরিবর্তনের সামগ্রিক প্রবণতা নির্দেশ করে।

অন্যদিকে, সেপ্টেম্বরের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির পর অক্টোবর মাসে সরকার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে অক্টোবরের শুরুতে নতুন করে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি না হলেও সেপ্টেম্বরের শেষভাগে কার্যকর হওয়া বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব পরিবহন ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় কতটা ছড়ায়, তা আগামী মাসের মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান অর্থনীতিতে দ্বিমুখী চাপের চিত্র তুলে ধরছে। একদিকে দুই মাসের নিম্নমুখী প্রবণতার পর সার্বিক মূল্যস্ফীতি আবার বেড়েছে; অন্যদিকে সেই সময়েই মজুরি বৃদ্ধির হার কমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ার পাশাপাশি খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপর অবস্থান করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম, যা পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ মূল্যচাপ তৈরি করতে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতি শুধু কত শতাংশে দাঁড়াল, তার পাশাপাশি মানুষের আয় কতটা বাড়ছে এবং সেই আয়ে আগের তুলনায় কতটা পণ্য ও সেবা কেনা যাচ্ছে সেটিই এখন অর্থনীতির বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

বিবিএস জানিয়েছে, দেশের ৬৪টি জেলার ১৪৩টি হাট-বাজার থেকে উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি ও মজুরি-সংক্রান্ত এই পরিসংখ্যান প্রস্তুত করা হয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়