১০ এয়ারবাস কিনতে চুক্তি সই করল বিমান
ছবি: সংগৃহীত
বহর আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ এবং আকাশপথে বৈশ্বিক যোগাযোগ আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি আধুনিক উড়োজাহাজ কেনার আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। দীর্ঘকাল ধরে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি বোয়িংনির্ভর থাকার পর, রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এই সংস্থার বহরে প্রথমবারের মতো এয়ারবাসের উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া শুরু হলো।
বুধবার (০৭ অক্টোবর) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে এই চুক্তি সম্পন্ন হয়।
উভয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই চুক্তির আওতায় বিমান এয়ারবাসের কাছ থেকে মোট ১০টি উড়োজাহাজ সংগ্রহ করবে। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ পাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে পরিচালনার জন্য চারটি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ এবং আঞ্চলিক ও মাঝারি দূরত্বের রুটে ব্যবহারের জন্য ছয়টি এ৩২১নিও ন্যারো-বডি উড়োজাহাজ।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৩ সাল থেকে এয়ারবাসের উড়োজাহাজগুলোর সরবরাহ শুরু হতে পারে এবং তা পর্যায়ক্রমে ২০৩৬ বা ২০৩৭ সাল পর্যন্ত চলমান থাকবে। তবে সরকারের তরফ থেকে এই সরবরাহ সময়সীমা এগিয়ে এনে ২০৩০ সালের আগেই অথবা ২০২৬-২৭ সালের মধ্যে অন্তত একটি উড়োজাহাজ হস্তান্তরের জন্য এয়ারবাসের প্রতি জোরালো অনুরোধ জানানো হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে ও বাণিজ্যিক গোপনীয়তার কারণে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার মোট বাণিজ্যিক মূল্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
এয়ারবাসের সঙ্গে এই চুক্তির পাশাপাশি চলতি বছর মার্কিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকেও মোট ২৫টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার সুনির্দিষ্ট চুক্তি করেছে বিমান। এর আগে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা) ব্যয়ে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়, যার মধ্যে ছিল আটটি ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি ৭৩৭-৮ মডেল। এরপর গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে আরও ১১টি বোয়িং (পাঁচটি ৭৮৭-১০ এবং ছয়টি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স) কেনার চুক্তি সম্পন্ন হয়।
সব মিলিয়ে এয়ারবাসের ১০টি এবং বোয়িংয়ের ২৫টি সর্বমোট ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে বিমানের বহরে নতুন উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়াবে ৩৫টিতে। এর মধ্যে ১৯টি হবে প্রশস্ত কাঠামোর (ওয়াইড-বডি) এবং ১৬টি সরু কাঠামোর (ন্যারো-বডি) উড়োজাহাজ। বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে সচল রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ, যার ১৪টি বোয়িং এবং ৫টি ড্যাশ-৮। তবে এর মধ্যে বেশ কিছু উড়োজাহাজ পুরোনো হয়ে পড়েছে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় বহর থেকে বাদ পড়ার কথা রয়েছে। বর্তমান ১৯টি উড়োজাহাজের সঙ্গে নতুন চুক্তিবদ্ধ ৩৫টি উড়োজাহাজ যুক্ত হলে অদূর ভবিষ্যতে বিমানের বহরে উড়োজাহাজের মোট সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: বিমানের ১০ এয়ারবাস কেনার চুক্তি ৭ অক্টোবর
নতুন উড়োজাহাজগুলো হাতে পেতে যেহেতু বেশ কয়েক বছর সময় লাগবে, তাই এই অন্তর্বর্তী সময়ে বিদ্যমান উড়োজাহাজগুলোর বয়স ও সক্ষমতার ঘাটতি মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। পুরোনো উড়োজাহাজগুলো বাদ পড়ার আগে আকস্মিক সক্ষমতা সংকট কাটিয়ে উঠতে বিমান আরও অন্তত ১০টি উড়োজাহাজ লিজ বা ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও এর আগে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও নানা জটিলতায় এখনো তা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি, তবুও স্বল্পমেয়াদি ঘাটতি পূরণে লিজ নেওয়ার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে, নতুন ও উন্নত প্রযুক্তির এই বিশাল বহর পরিচালনার জন্য দক্ষ বৈমানিক, প্রকৌশলী তৈরি এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তোলার পূর্ণ প্রস্তুতিও শুরু করেছে রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইন্সটি।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, ইনভেস্ট বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বিমানের চেয়ারম্যান রুমি এ হোসেন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাইজার সোহেল আহমেদ অংশ নেন। নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এয়ারবাস ইন্ডিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুর্গেন ওয়েস্টারমায়ার (যিনি ইউর্গেন ওয়েস্টারমেয়ার নামেও পরিচিত)। অনুষ্ঠানে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও স্পেনের রাষ্ট্রদূতসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধি দলের প্রধান মাইকেল মিলার এই চুক্তিকে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক গভীর করার ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, এয়ারবাস বেছে নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন, নিরাপত্তা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহারের (ভ্যালু ফর মানি) প্রতিফলন। বাংলাদেশ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ ৩০ অর্থনীতির দেশে পরিণত হওয়ার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তাতে এভিয়েশন খাত মুখ্য ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুকও বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের ধারাবাহিক উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যুক্তরাজ্যের জোরালো সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। ইনভেস্ট বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, এয়ারবাসের সঙ্গে এই চুক্তি কেবল উড়োজাহাজ কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি দেশের ভেতরে বিমান রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহল (এমআরও) শিল্প গড়ে তোলার অপার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সবমিলিয়ে, সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার হাত ধরে বাংলাদেশ এভিয়েশন খাত এক নতুন ও বিশ্বমানের অগ্রযাত্রার পথে পা বাড়িয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








