ডেঙ্গুতে এক দিনে আরও ৮ জনের প্রাণহানি
ফাইল ছবি
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও এর ফলে মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে আরও ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগের দিন চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ ১০ জনের মৃত্যুর রেকর্ড হওয়ার পর, সাম্প্রতিক এই মৃত্যুগুলো পরিস্থিতিকে আরও বেশি শঙ্কাগ্রস্ত করে তুলেছে। নতুন এই প্রাণহানির ফলে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২৮৯ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে ১ হাজার ৮৬০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর ফলে চলতি বছরের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মোট সংখ্যা পৌঁছেছে ৯২ হাজার ২১৬ জনে। গত একদিনে দেশের বিভিন্ন বিভাগে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে খুলনা বিভাগে ৩৭৬ জন, ঢাকা বিভাগে সিটির বাইরে ৩৪৭ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২১৬ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২১২ জন, বরিশাল বিভাগে ২০০ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৭৬ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৭১ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১১০ জন, রংপুর বিভাগে ৩৮ জন এবং সিলেট বিভাগে ১৪ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত ৮ জনের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে দুইজন করে এবং বরিশাল ও সিলেট বিভাগে একজন করে প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া একই সময়ে সারা দেশে ডেঙ্গু থেকে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ হাজার ৮৫২ জন রোগী, যার ফলে মোট সুস্থ হওয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৬ হাজার ১৫২ জনে।
চলতি বছরের অক্টোবর মাস ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মাসটির প্রথম সাত দিনের ভেতরেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৪ জন। এর আগে চলতি বছরের বিভিন্ন মাসের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জন, আগস্টে ৪৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং জুনে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এ ছাড়া মে মাসে ১ জন এবং বছরের শুরুর দুই মাস জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে মারা যাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ডেঙ্গুর এই ক্রমবর্ধমান বিস্তার রোধে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে বিভিন্ন সচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও মাঠপর্যায়ে এডিস মশা নিধন ও মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের কার্যকারিতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও ১০ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত দুই সহস্রাধিক
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে কেবল হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামলানোই যথেষ্ট নয়, বরং সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে আরও জোরালোভাবে লার্ভিসাইড প্রয়োগ এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষকে ঘরের আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং দিনের বেলাতেও মশারি কিংবা কয়েল ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বছরওয়ারি মারাত্মক রূপ ধারণ করে আসছে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৪১৩ জনের।
এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মৃতের সংখ্যা ছিল ৫৭৫ জন। আর অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে ভয়াবহ মহামারী রূপ নিয়েছিল, যে বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে এডিস মশার প্রজনন মৌসুম দীর্ঘায়িত হচ্ছে, যা ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে শুধুমাত্র সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে এবং জ্বর বা ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা মাত্রই বিলম্ব না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া নিশ্চিত করতে হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








