নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:৫৮, ৭ অক্টোবর ২০২৬

অণুর ‘একহাতি’ রহস্যে রসায়নে নোবেল বিজয়ী কাগান ও সোয়াই

অণুর ‘একহাতি’ রহস্যে রসায়নে নোবেল বিজয়ী কাগান ও সোয়াই

অঁরি কাগান ও কেনসো সোয়াই। ছবি: সংগৃহীত

অ্যাসিমেট্রিক অর্গানিক সিন্থেসিস বা অসমমিত জৈব সংশ্লেষণে যুগান্তকারী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন ফরাসি রসায়নবিদ হেনরি বি. কাগান এবং জাপানি বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই। রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অরৈখিক প্রভাব এবং স্ব-অনুঘটন বা অটোক্যাটালাইসিস আবিষ্কারের মাধ্যমে ওষুধশিল্প, সুগন্ধি এবং নতুন সামগ্রী উৎপাদনের ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় দিগন্ত উন্মোচন করায় রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস তাঁদের এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছে।

বুধবার (০৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এবছরের রসায়ন নোবেলজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।

নোবেল কমিটির অফিশিয়াল বিবৃতে জানানো হয়েছে যে, জীবনপ্রক্রিয়া বা প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম ব্যতিরেকে কৃত্রিম রসায়ন ব্যবস্থায় যুগান্তকারী ধাঁধার সমাধান করায় দুই বিজ্ঞানী এই সম্মান অর্জন করেছেন। বিজয়ী হেনরি বি. কাগান ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি প্যারিস-সুদে এবং কেনসো সোয়াই জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সাইন্সে কর্মরত রয়েছেন।

বিজ্ঞানের দীর্ঘদিনের এক রহস্যের সমাধানপ্রকৃতি ও জীবদেহের অন্যতম এক মৌলিক রহস্য হলো অণুর সুনির্দিষ্ট জীবনঘনিষ্ঠ গঠন। অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ অণু দুটি ভিন্ন রূপে অবস্থান করে, যেগুলো দেখতে একে অপরের ঠিক আয়না-প্রতিচ্ছবি বা মিরর ইমেজ বা এনানশিওমার হয়ে থাকে। রাসায়নিক ভাষায় এগুলোর ডানহাতি (ডি–ফর্ম) ও বামহাতি (এল–ফর্ম) রূপ রয়েছে। মানুষের হাত দুটি দেখতে একই রকম হলেও যেমন একটির ওপর আরেকটি নিখুঁতভাবে মেলে না, ঠিক তেমনই এসব অণুর ক্ষেত্রেও ত্রিভুজাকৃতি বা আণবিক কাঠামোর এই ভিন্নতা দেখা যায়।

আরও পড়ুন: নিউট্রিনো গবেষণায় নোবেল পেলেন ফ্রান্সিস হালজেন

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, জীবদেহের প্রোটিন বা কোষে এই দুই রূপের সাধারণত একটিমাত্র রূপই (যেমন নির্দিষ্ট লেভো বা ডেক্সট্রো রূপ) সক্রিয়ভাবে বিদ্যমান থাকে, অন্য রূপটি প্রকৃতিতে অত্যন্ত বিরল। অথচ গবেষণাগারে সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়া পরিচালনা করলে আপনা-আপনি ৫০ শতাংশ ডানহাতি এবং ৫০ শতাংশ বামহাতি অণুর একটি মিশ্রণ তৈরি হয়। জীবজগতে অণুর এই একমুখী বা সমতাররীতি কীভাবে তৈরি হলো দীর্ঘদিন ধরে তা রসায়নবিদদের কাছে একটি বিরাট রহস্য ও ধাঁধা ছিল। 

কাগান ও সোয়াইয়ের যুগান্তকারী গবেষণা এই জটিল রহস্যেরই সমাধান করেছে। এই ঐতিহাসিক অর্জনের পথে প্রধানত দুটি ধাপে বড় অগ্রগতি সাধিত হয়েছে:

১. হেনরি কাগানের অবদান: ১৯৮৬ সালে ফরাসি রসায়নবিদ হেনরি বি. কাগান রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের এক অভিনব পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। অসমমিত রাসায়নিক বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে এটি ছিল এক বিশাল মাইলফলক, যার মাধ্যমে পূর্বের ধারণার চেয়ে একটি নির্দিষ্ট মিরর ইমেজের আধিক্য বা অনুপাত বহুগুণ বাড়িয়ে তোলা সম্ভব হয়।

২. কেনসো সোয়াইয়ের অবদান: পরবর্তীতে এই গবেষণাকে চূড়ান্ত সফলতার দিকে নিয়ে যান জাপানি বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই। ১৯৯৫ সালে তিনি এমন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার অভিনব নকশা তুলে ধরেন, যা নির্দিষ্ট একমুখী মিরর ইমেজ তৈরিতে সহায়ক ছিল। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে তিনি আরও বড় সাফল্য অর্জন করে এমন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া প্রদর্শন করেন, যেখানে সম্ভাব্য দুটি মিরর ইমেজের মধ্যে কেবল এবং কেবল একটি নির্দিষ্ট রূপেরই সম্পূর্ণ উদ্ভব ঘটে। 

নোবেল কমিটির মতে, জীবন নিজে ছাড়া এর আগে অন্য কোনো কৃত্রিম রাসায়নিক ব্যবস্থায় এমন ঘটনা কখনোই দেখা যায়নি।

কাগান ও সোয়াইয়ের এই আবিষ্কারের সুফল কেবল গবেষণাগারে বা তাত্ত্বিক রসায়নে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর বাস্তবিক প্রয়োগ অত্যন্ত ব্যাপক। বিশেষ করে ওষুধ প্রস্তুতকরণ ও ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে অণুর সুনির্দিষ্ট গঠন বা মিরর ইমেজ অত্যন্ত নিখুঁত হওয়া জরুরি। একই রাসায়নিক উপাদানের দুটি ভিন্ন আয়না-রূপ মানবদেহে সম্পূর্ণ ভিন্ন বা বিপরীত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে যার একটি রূপ যেখানে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ হিসেবে কাজ করে, অন্য রূপটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে অথবা নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে। তাই কাঙ্ক্ষিত এবং নির্দিষ্ট রূপটি শতভাগ নির্ভুলভাবে পৃথক ও উৎপাদন করার এই প্রযুক্তি মানবকল্যাণে ও ওষুধশিল্পে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটিয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়