নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:১৪, ৭ অক্টোবর ২০২৬

নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির অভিযোগে ৪ পুলিশ গ্রেফতার

নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির অভিযোগে ৪ পুলিশ গ্রেফতার

ফাইল ছবি

নাগরিকের ব্যক্তিগত ও গোপনীয় তথ্য সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটি অংশের অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে ভুয়া মামলা ও সাধারণ ডায়েরির (জিডি) তথ্য দেখিয়ে নাগরিকের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য, মোবাইল সিমের সর্বশেষ অবস্থানসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্রির অভিযোগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার বিভাগ চার পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। 

গ্রেপ্তার চারজন হলেন ডেমরা থানার কনস্টেবল সাইমন হোসেন রাশেদ, কনস্টেবল মাসুম মিয়া, ওয়ারী থানার কনস্টেবল নিজাম উদ্দীন এবং তুরাগ থানার কনস্টেবল মো. জিহাদ মিয়া। 

বুধবার (০৭ অক্টোবর) বিষয়টি নিশ্চিত করেন ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। 

তিনি জানিয়েছেন, সিডিআরসহ বিভিন্ন গোপন তথ্য সংগ্রহ করে বিক্রির অভিযোগে কয়েক দিন আগে তাদের গ্রেফতার করা হয় এবং রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। 

সংশ্লিষ্ট চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গত ২৯ সেপ্টেম্বর ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) আবিদুর রহমান বাদী হয়ে রমনা থানায় মামলা করেন। মামলায় অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ এবং দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম উত্তর বিভাগ।

ঘটনাটির সূত্রপাত হয় অনলাইনে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য কেনাবেচার একটি সক্রিয় বাজারের সন্ধান পাওয়ার মধ্য দিয়ে। ডিবির সাইবার মনিটরিংয়ের সময় গত ১০ সেপ্টেম্বর ফেসবুকের একটি অ্যাকাউন্ট, হোয়াটসঅ্যাপের একটি অ্যাকাউন্ট এবং টেলিগ্রামের একটি গ্রুপে বিভিন্ন মুঠোফোন নম্বরের সিডিআর বিক্রির তথ্য নজরে আসে। পরে অনুসন্ধানে সিডিআর বিক্রির অর্থ গ্রহণে ব্যবহৃত একটি বিকাশ নম্বরের তথ্যও পাওয়া যায়। একই সময় মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকেও ডিবিকে জানানো হয়, সরকারি একটি মুঠোফোন নম্বর ব্যবহার করে তিনটি নম্বরের সিডিআর সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং পরে সেসব তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব তথ্যের সূত্র ধরে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম উত্তর বিভাগ তদন্ত শুরু করে। তদন্তে সরকারি ই-মেইল ব্যবহারের সুযোগ, থানায় কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তথ্য চাওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো সামনে আসে।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, তুরাগ থানার সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে ১১টি মুঠোফোন নম্বরের তিন মাসের সিডিআর ও এনআইডি তথ্য চাওয়া হয়েছিল। ওই আবেদনে তুরাগ থানায় করা একটি জিডির নম্বর এবং এএসআই শাহীনুল কবিরের নাম ব্যবহার করা হয়। কিন্তু পরবর্তী অনুসন্ধানে দেখা যায়, আবেদনে উল্লেখ করা জিডিটি থানায় নথিভুক্তই হয়নি। সংশ্লিষ্ট এএসআইও ওই নম্বরগুলোর সিডিআর চাননি। 

আরও পড়ুন: দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ করতে ডিএমপির কড়া নিরাপত্তা ও বিশেষ নির্দেশ

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, তুরাগ থানায় কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কনস্টেবল জিহাদ মিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে ভুয়া জিডির সূত্রে ওই তথ্য চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সংগৃহীত তথ্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাঠানোর প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, আইনগত তদন্তের প্রয়োজনে যে প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে নাগরিকের তথ্য চাওয়া হয়, সেই কাঠামোকেই ব্যবহার করে ভুয়া নথির আড়ালে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে।

ডেমরা থানার ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধরনের কৌশল ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। থানার ওসির সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে কয়েকটি মুঠোফোন নম্বরের সিডিআর চাওয়া হয়। আবেদনে একটি মামলার নম্বর এবং তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে একজন এসআইয়ের নাম ব্যবহার করা হলেও অনুসন্ধানে ওই মামলার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি এবং সংশ্লিষ্ট এসআইও এসব নম্বরের সিডিআর চাননি। এ ধরনের ভুয়া মামলা ও তদন্ত কর্মকর্তার পরিচয় ব্যবহার করে সিডিআর সংগ্রহের সঙ্গে কনস্টেবল সাইমন হোসেন রাশেদ ও মাসুম মিয়ার সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা এজাহারে বলা হয়েছে। প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনে এই আবেদনের তারিখ হিসেবে ভিন্ন তথ্য এসেছে; ফলে তারিখটির পরিবর্তে মামলার এজাহারে বর্ণিত মূল অভিযোগটিকেই এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, কনস্টেবল নিজাম উদ্দীনের বিরুদ্ধে ডেমরা থানায় কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সিডিআর সংগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। পরে ওয়ারী থানায় বদলি হওয়ার পরও থানার ওসির সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে বিভিন্ন নম্বরের সিডিআর সংগ্রহের তথ্য তদন্তে পাওয়া গেছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তার ব্যক্তিগত মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ পর্যালোচনায় বিভিন্ন নম্বরের সিডিআর আদান-প্রদান এবং টাকা গ্রহণের তথ্য পাওয়া গেছে বলেও মামলার নথিতে দাবি করা হয়েছে। 

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, চার পুলিশ সদস্যের কয়েকজন থানায় কম্পিউটার-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করায় সরকারি ই-মেইল ও তথ্য চাওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগের সুযোগ ছিল। সেই সুযোগ ব্যবহার করেই ভুয়া মামলা বা জিডির নম্বর দেখিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়ে থাকতে পারে বলে তদন্তকারীদের ধারণা। তবে এই অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ হবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায়।

তদন্তে উঠে আসা তথ্যের পরিধি শুধু সিডিআরেই সীমাবদ্ধ নয়। মামলায় নাগরিকের সিম বা মুঠোফোন নম্বরের কললিস্ট, সর্বশেষ কলের লোকেশন, এনআইডি-সংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন তথ্য বেআইনিভাবে সংগ্রহ, অন্যের কাছে হস্তান্তর এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্যের বাজার নিয়ে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানেও সিডিআরের পাশাপাশি এনআইডি, পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন, টিআইএন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, মোবাইল সিমের মালিকানা, আইএমইআই, আইএমএসআই, মোবাইলের অবস্থান এবং মোবাইল আর্থিক সেবার নিবন্ধন ও লেনদেন-সংক্রান্ত তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন পাওয়ার কথা উঠে এসেছে।

তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের সাম্প্রতিক অনুসন্ধান এই অনলাইন বাজারের ব্যাপ্তি সম্পর্কে আরও উদ্বেগজনক চিত্র দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এক মাসের অনুসন্ধানে ফেসবুকে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির ৬০০টির বেশি পোস্ট শনাক্ত করে এবং এসব পোস্টের সূত্র ধরে অন্তত ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইটের সন্ধান পাওয়ার কথা জানায়। অনুসন্ধানে বিক্রেতাদের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে সিডিআর, সর্বশেষ অবস্থান এবং এনআইডির তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করার তথ্যও প্রকাশ করা হয়। 

বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তিন মাসের সিডিআরের জন্য প্রায় ১ হাজার ৫০ টাকা এবং ছয় মাসের সিডিআরের জন্য প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার দাবি করা হচ্ছে। ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও তথ্য সরবরাহে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

এই বাজারের আরেকটি দিক সামনে আসে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি র‍্যাবের পৃথক অভিযানে। ১৩ সেপ্টেম্বর স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-২ নাগরিকের ব্যক্তিগত ও গোপনীয় তথ্য অনলাইনে বিক্রির অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেফতারের কথা জানায়। তারা হলেন আব্দুস সালাম সরকার, সুব্রত চন্দ্র পাল, ইসমাইল হোসেন সোহাগ, এসএম নাফি ও মো. মেহেদী হাসান। 

র‍্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেফতার ব্যক্তিরা অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহক সংগ্রহ করতেন এবং নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহ করতেন। আব্দুস সালাম সরকার ই-সেবা২৪ডটটপ নামে একটি এনক্রিপ্টেড ওয়েবসাইট তৈরি করেছিলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়ার কথা জানায় র‍্যাব। ওই ওয়েবসাইট ও বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ-টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে সিমের সর্বশেষ কলের অবস্থান, রেডিও লোকেশন, আইএমইআই সার্চ তথ্য, সিডিআর, সিমের মালিকানা, বিকাশ ও নগদ নিবন্ধন এবং লেনদেনের তথ্য বিক্রির অভিযোগও সামনে আসে। 

র‍্যাব তখন জানিয়েছিল, ওই ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারও যোগসাজশের তথ্য তারা পায়নি; সরকারি সার্ভার থেকে তথ্য কীভাবে বাইরে গেছে, সেটিও তদন্তাধীন ছিল।

এরপর চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে একই ধরনের তথ্য সংগ্রহ ও বিক্রির অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। কারণ, সাধারণ অনলাইন অপরাধীচক্র তথ্যের বাজারে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোনো সদস্য যদি তদন্তের বৈধ প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করেন, তাহলে সেই তথ্যের উৎস শনাক্ত করা যেমন কঠিন হয়, তেমনি নাগরিকের গোপনীয়তা ও রাষ্ট্রীয় তথ্যব্যবস্থার নিরাপত্তা দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকি বাড়ে। ডিবি এখন শুধু গ্রেফতার চার পুলিশ সদস্যের ভূমিকা নয়, তাদের সঙ্গে বাইরের তথ্য বিক্রেতা, ক্রেতা, মধ্যস্থতাকারী এবং সরকারি তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পুরো চক্র শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন।

মুঠোফোনের তথ্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও এই ঘটনায় স্পষ্ট। একটি সিডিআরে সাধারণত কোনো নম্বর থেকে কখন কোন নম্বরে কল হয়েছে, কলের সময়কাল, কল করা বা গ্রহণের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক সেল বা টাওয়ারের মতো প্রযুক্তিগত তথ্য থাকতে পারে। এর সঙ্গে ডিভাইস শনাক্তকারী আইএমইআই ও সিম-সংক্রান্ত তথ্য যুক্ত হলে নির্দিষ্ট একটি নম্বর কোন ডিভাইসে ব্যবহৃত হয়েছে বা কোনো সময়ে আনুমানিক কোন এলাকায় ছিল, সে সম্পর্কে ধারণা করা সম্ভব। দীর্ঘ সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে একজন ব্যক্তির চলাচলের একটি সম্ভাব্য চিত্রও তৈরি করা যায়। তবে সিডিআরকে সরাসরি কথোপকথনের অডিও বা হোয়াটসঅ্যাপ, সিগন্যাল, টেলিগ্রামের মতো অ্যাপের বার্তার কনটেন্ট হিসেবে দেখা ঠিক নয়; এসব অ্যাপের এনক্রিপ্টেড যোগাযোগের বিষয়টি সিডিআরের আলাদা কাঠামোর বাইরে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এই তথ্য বৈধ তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও হতে পারে। হত্যা, অপহরণ, ছিনতাই, নিখোঁজসহ বিভিন্ন মামলায় সন্দেহভাজন ব্যক্তির যোগাযোগ ও অবস্থানের সূত্র বের করতে আদালত ও আইনগত প্রক্রিয়ার আওতায় মুঠোফোন-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ ১২টি সরকারি সংস্থার মোবাইল অপারেটরদের তথ্যভান্ডার ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। মোবাইল অপারেটরদের কাছে নাগরিকের যোগাযোগ-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণেরও আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে এই ব্যবস্থার নিরাপত্তা কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; কোন কর্মকর্তা কখন কোন তথ্য চাইলেন, কোন সরকারি ই-মেইল থেকে আবেদন গেল, আবেদনটির পেছনে বাস্তব মামলা বা জিডি আছে কি না এবং তথ্য পাওয়ার পর তা কোথায় ব্যবহৃত হলো প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশে এই ঝুঁকির পরিধিও ছোট নয়। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে প্রায় ১৯ কোটি ১০ লাখ সক্রিয় মুঠোফোন সিম থাকার তথ্য জানিয়েছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট তথ্য; বিটিআরসির পরিসংখ্যানেও দেশে সক্রিয় মুঠোফোন সংযোগের সংখ্যা ১৯ কোটির আশপাশে রয়েছে। অর্থাৎ কোটি কোটি সংযোগের বিপরীতে তৈরি হওয়া বিপুল তথ্যভান্ডারের সামান্য অংশের অপব্যবহারও ব্যাপকসংখ্যক নাগরিককে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির এই প্রবণতা নিয়ে এরই মধ্যে নাগরিক নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার প্রশ্ন জোরালো হয়েছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমনকি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও মন্ত্রীর মুঠোফোনের তথ্যও অনলাইনে বিক্রির অভিযোগ সামনে এসেছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, কারও কলের তথ্য বা অবস্থানের রেকর্ড অন্যের হাতে চলে গেলে শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, তা অনুসরণ, হয়রানি, প্রতারণা, চাঁদাবাজি বা অন্য অপরাধে ব্যবহার হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করে। ফলে অনলাইনে তথ্য বিক্রি বন্ধের পাশাপাশি তথ্যের মূল উৎসে নিরাপত্তা জোরদার, সরকারি ই-মেইল ব্যবহারে বহুপদক্ষেপের যাচাই, ভুয়া মামলা বা জিডি নম্বর শনাক্তে স্বয়ংক্রিয় যাচাই ব্যবস্থা, তথ্য অ্যাক্সেসের অডিট ট্রেইল এবং অননুমোদিত প্রবেশের ক্ষেত্রে দ্রুত জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।

চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে করা মামলায় দণ্ডবিধির ৪২০, ৪০৯ ও ১০৯ ধারাসহ সরকারি গোপনীয়তা-সংক্রান্ত আইনের প্রয়োগের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। ৪২০ ধারায় প্রতারণা, ৪০৯ ধারায় সরকারি কর্মচারীর অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ এবং ১০৯ ধারায় অপরাধে প্ররোচনা বা সহায়তার বিষয় রয়েছে। তবে মামলা, গ্রেফতার ও এজাহারে থাকা অভিযোগ এখনো বিচারিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। ডিবির তদন্তে যদি এই চারজনের বাইরে আরও কেউ সরকারি তথ্য সংগ্রহ, সরবরাহ, বিক্রি বা অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পায়, তাহলে তাদেরও আইনের আওতায় আনার কথা জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা। ফলে এই মামলার পরবর্তী তদন্ত শুধু চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সরকারি তথ্যব্যবস্থা থেকে ব্যক্তিগত তথ্য বেরিয়ে কীভাবে একটি অনলাইন বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কে পৌঁছেছে, সেই পুরো সরবরাহশৃঙ্খল উন্মোচনই এখন তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়