বিনোদন ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:৩৩, ৮ অক্টোবর ২০২৬

নানা পাটেকর এবং তার কালজয়ী ৯ চরিত্র

নানা পাটেকর এবং তার কালজয়ী ৯ চরিত্র

ছবি: এআই জেনারেটেড

চলে গেলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী, নির্ভীক ও স্বতন্ত্র অভিনেতা নানা পাটেকর। নিজস্ব সংলাপ বলার ক্ষুরধার ভঙ্গি, ব্যতিক্রমী অভিনয়শৈলী এবং পর্দায় অনন্য উপস্থিতির জন্য কোটি দর্শকের হৃদয়ে রাজত্ব করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে গোয়ায় নিজ বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) এই প্রবীণ অভিনেতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। 

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তার এই আকস্মিক প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে।

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তার তীক্ষ্ণ সংলাপ পরিবেশন, চোখের তীব্র অভিব্যক্তি এবং অতি-বাস্তব অভিনয়শৈলী নানা পাটেকরকে অন্য চারপাঁচজন তারকা অভিনেতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। সোজাসাপ্টা কথা আর অনবদ্য ব্যক্তিত্ব দিয়ে তিনি দর্শককে যেমন কাঁদিয়েছেন, তেমনই আবার হাস্যরসে ভাসিয়েছেন।

নানা পাটেকরের কর্মজীবনের সেরা ও বহুল চর্চিত কয়েকটি চলচ্চিত্র এবং তার সেই কালজয়ী চরিত্রগুলোর দিকে চলুন ফিরে দেখা যাক-

১. পরিন্দা (১৯৮৯) — আন্না শেঠ
বিধু বিনোদ চোপড়ার এই ক্লাসিক গ্যাংস্টার চলচ্চিত্রে নানা পাটেকর অভিনয় করেছিলেন আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন 'আন্না শেঠ'-এর চরিত্রে। আগুনের প্রতি তীব্র ভয় আর প্রচণ্ড মানসিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে তৈরি এই খলচরিত্রটি ছিল অত্যন্ত মনস্তাত্ত্বিক। এই সিনেমায় চোখ ধাঁধানো অভিনয়ের জন্য তিনি তার প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (সেরা পার্শ্ব অভিনেতা) অর্জন করেন।

২. ক্রান্তিবীর (১৯৯৪) — প্রতাপ তিলক
নানা পাটেকরের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা এবং ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র এটি। আঁখে খোল কে দেখো... কিংবা ইয়ে হিন্দু কা খুন, ইয়ে মুসলমান কা খুন...—এই ছবির সংলাপ আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। একজন সাধারণ, অলস ও উদাসীন যুবক থেকে সমাজের অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এক তীব্র সামাজিক প্রতিবাদী চরিত্র-প্রতাপ তিলক।

এই চরিত্রে অনবদ্য পারফরম্যান্সের জন্য নানা পাটেকর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (সেরা অভিনেতা), ফিল্মফেয়ার এবং স্টার স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড পান।

আরও পড়ুন: ৭৫ বছরে না ফেরার দেশে কিংবদন্তি অভিনেতা নানা পাটেকর

৩. খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল (১৯৯৬) — জোসেফ ব্রেগাঞ্জা
সঞ্জয় লীলা বানসালির প্রথম চলচ্চিত্র খামোশি-তে এক বধির ও মুখ পিতা 'জোসেফ'-এর চরিত্রে অভিনয় করেন নানা। সংলাপ ছাড়াই কেবল হাতের অঙ্গভঙ্গি ও মুখের এক্সপ্রেশন দিয়ে তিনি এক বাবার ভালোবাসা, অভিমান ও বেদনার চিত্র ফুটিয়ে তোলেন। তার এই অভিনয় দর্শককে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করেছিল। দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই স্মৃতি হাজারো দর্শকের মনে গেঁথে থাকবে বহুকাল।

৪. আব তক ছাপ্পান (২০০৪) — ডায়াল ৫৬ / সাধু আগাশে
এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট পুলিশ ইন্সপেক্টর সাধু আগাশের চরিত্রে অভিনয় করে  ক্রাইম-থ্রিলার ধারায় নতুন মাত্রা যোগ করেন নানা পাটেকর। শান্ত কিন্তু অত্যন্ত মারাত্মক এক পুলিশ অফিসার, যে আন্ডারওয়ার্ল্ড দমন করতে কোনো আপস করেন না। গাম্ভীর্য ও কৌশলী মানসিকতার এক অসাধারণ মেলবন্ধনের বাস্তবরূপই যেন দেখতে পান দর্শক তার অনবদ্ধ অভিনয়ে।

৫. ওয়েলকাম (২০০৭) — উদয় শেঠ (উদয় ভাই)
সিরিয়াস কিংবা অ্যাকশন চরিত্র ছাড়াও নানা পাটেকর যে কমেডিতেও সমান পারদর্শী, তা প্রমাণ করে আনিস বাজমির এই সুপারহিট কমেডি ছবিটির মাধ্যমে।
ডন হয়েও একজন ভালো শিল্পী (চিত্রশিল্পী) হওয়ার অদ্ভুত ইচ্ছা আর বোনকে ভালো ঘরে বিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যাকুল এক বড় ভাই। কন্ট্রোল মজনু, কন্ট্রোল... সংলাপে তিনি দর্শককে হাসির জোয়াড়ে ভাসিয়েছিলেন।

৬. নটসম্রাট (২০১৬) — গণপৎরাও রামচন্দ্র বেলভালকর (মারাঠি)
নানা পাটেকরের অভিনয় জীবনের অন্যতম সেরা ও আবেগঘন পারফরম্যান্স ছিল মারাঠি ছবি 'নটসম্রাট'-এ। এক অবসরপ্রাপ্ত থিয়েটার অভিনেতা যে বাস্তব জীবনে তার সন্তানদের কাছ থেকে অবহেলা ও ত্যাগের শিকার হয়। একজন শিল্পীর মানসিক যন্ত্রণা ও ট্র্যাজেডি তিনি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা দর্শকদের চোখ ভিজিয়ে দিয়েছিল।

৭. কালা (২০১৮) — হরিদেব অভয়ঙ্কর (হরি দাদা)
দক্ষিণী সুপারস্টার রজনীকান্তের বিপরীতে এই তামিল ছবিতে খলনায়কের ভূমিকায় দেখা যায় নানা পাটেকরকে। ধার্মিক ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিকের ছদ্মবেশে থাকা এক নির্মম ও ক্ষমতা লোভী ডন। রজনীকান্তের বিপরীতে তার তীক্ষ্ণ উপস্থিতি ও শক্তিশালি সংলাপ বিনিময় ছিল দেখার মতো।

৮. দ্য ভ্যাকসিন ওয়ার (২০২৩) — ড. বলরাম ভার্গব
বিবেক অগ্নিহোত্রী পরিচালিত এই ছবিতে ভারতীয় চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (ICMR) তৎকালীন মহাপরিচালক ড. বলরাম ভার্গভের চরিত্রে অভিনয় করেন নানা। কোভিড-১৯ মহামারীর কঠিন সময়ে দেশীয় ভ্যাকসিন (কোভ্যাক্সিন) তৈরির পেছনে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের নেতৃত্ব দেওয়ার এক সংকল্পবদ্ধ, গম্ভীর ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রূপ তিনি পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন।

৯. দ্য সিগনেচার (২০২৪) — অরবিন্দ
অনুপম খেরের সাথে যৌথভাবে অভিনয়ে তিনি শেষদিকের এই সামাজিক-ড্রামা ছবিতে নজর কাড়েন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও কঠিন বাস্তবতার মুখে প্রিয়জনদের পাশে দাঁড়ানো এক আবেগপূর্ণ ও সংবেদনশীল মানুষের চরিত্রে তার অভিনয় ছিল অত্যন্ত বাস্তবসম্মত।

নানা পাটেকর কেবল বড় পর্দাতেই তার ছাপ রেখে যাননি; চলচ্চিত্র জগতের  বাইরে 'নাম ফাউন্ডেশন'-এর মাধ্যমে মহারাষ্ট্রের খরা পীড়িত কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে বাস্তাব জীবনেও হয়ে উঠেছিলেন আসল নায়ক। ভারতীয় চলচ্চিত্রে তার রেখে যাওয়া পদচিহ্ন ও কালজয়ী চরিত্রগুলো সিনেমা প্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।ৃ

নিউজবাংলাদেশ.কম/এনডি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়