আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১০:৪৮, ৮ অক্টোবর ২০২৬

রুশ হামলায় ইউক্রেনে ৫ শিশুসহ নিহত ২৮

রুশ হামলায় ইউক্রেনে ৫ শিশুসহ নিহত ২৮

ছবি: সংগৃহীত

ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ চেরনিহিভসহ দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে তীব্র আক্রমণ চালিয়েছে রুশ বাহিনী। গত মঙ্গলবার (০৬ অক্টোবর) দিবাগত রাত থেকে শুরু হওয়া এই ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনজুড়ে কমপক্ষে ২৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে ৫ জন নিষ্পাপ শিশুও রয়েছে। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে চলমান এই সংঘাতে এটিকে অন্যতম ঘৃণ্য ও বর্বরোচিত হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ইউক্রেনীয় নেতৃত্ব।

রাশিয়ান ক্ষেপণাস্ত্রের সবচেয়ে নির্মম আঘাত হানার স্থানগুলোর একটি ছিল চেরনিহিভ প্রদেশের প্রিলুকি জেলা। 

বুধবার (০৭ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে আকস্মিক এক শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে প্রিলুকির একটি পাঁচতলা আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকে। ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা সাধারণ নাগরিকেরা এই হামলার শিকার হন।

বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, ভবনটির জানালার কাচ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে দূরে ছিটকে পড়ে এবং পাঁচতলা ভবনটির প্রায় অর্ধেক অংশ সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়া কংক্রিট ও বিকৃত ধাতব কাঠামোর স্তূপে পরিণত হয়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের দপ্তরের পৃথক এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, প্রিলুকির শুধু ওই একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনেই হামলায় ২০ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক আবেগঘন ও ক্ষুব্ধ বিবৃতিতে জানান, নিহত শিশুদের মধ্যে তিনজনের বয়স ছিল মাত্র ১২ মাস এবং অপর এক শিশুর বয়স আট বছর। পরবর্তীতে ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দিনব্যাপী উদ্ধারকাজ চালানোর সময় সন্ধ্যা নাগাদ ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আরও এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই হামলায় বহু মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। 

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি নিশ্চিত করেছেন যে, আহতদের মধ্যে আরও অন্তত সাতজন শিশু রয়েছে, যারা হাসপাতালের বিছানায় চিকিৎসাধীন।

এই বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়াকে সরাসরি অভিযুক্ত করেছেন। তিনি বলেন, মস্কো ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক শহর ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।

বিবৃতিতে জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেন তথা আমাদের জনগণ ও শিশুদের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রের এই অব্যাহত ব্যবহার হলো সন্ত্রাস সৃষ্টির এক সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। 

আরও পড়ুন: ইরানে আবার হামলার পথ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কিছু ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূপাতিত করা সম্ভব হলেও, রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশ রক্ষায় অবিলম্বে আরও আধুনিক ও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি।

রাশিয়ার এই আকস্মিক ও সর্বগ্রাসী হামলার শিকার সাধারণ মানুষের বিবরণে উঠে এসেছে এক বিভীষিকাময় চিত্র। 
প্রিলুকির বাসিন্দা এবং পেশায় ম্যাসাজ থেরাপিস্ট ৪০ বছর বয়সী ওলেনা সায়ুন সংবাদমাধ্যম এএফপিকে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে বলেন, আমরা বাড়িতে ঘুমাচ্ছিলাম। হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণে আমাদের জানালার কাচ উড়ে যায়। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ যে, আমরা নিজেদের শরীর দিয়ে আমাদের শিশু সন্তানকে আগলে রাখতে পেরেছিলাম। এই ঘটনায় আমার স্বামীর পিঠে এবং আমার শরীরেও নানা স্থানে কাটাছেঁড়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, হামলার পর আমাদের সন্তানের প্রচণ্ড মানসিক আঘাত বা নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়েছিল এবং সে ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল। আমরা দ্রুত বাথরুমের দিকে ছুটে যাই এবং অ্যাপার্টমেন্টের সবকিছু যখন তছনছ হয়ে যাচ্ছিল, আমরা সেখানেই আতঙ্কিত অবস্থায় অবরুদ্ধ ছিলাম।

প্রিলুকির ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটির নিকটেই বসবাসকারী ৩১ বছর বয়সী অনলাইন বিপণনকর্মী ইউলিয়া শামরাই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই অন্ধ ও নৃশংস হামলার মাধ্যমে রাশিয়ার ঠিক কোন সামরিক লক্ষ্য পূরণ হলো, তা আমার বোধগম্য নয়।

শীতকাল ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ বড় শহরগুলোতে রুশ হামলার মাত্রা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত মঙ্গলবারই প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি একটি ব্যাপক হামলার বিষয়ে পূর্বাভাস দিয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছিলেন। সেই সতর্কবার্তায় বিশেষ করে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল।

বুধবারের এই হামলার পর থেকে রাজধানী কিয়েভে প্রায় অবিরাম বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বা সাইরেন বেজে চলেছে। চরম আতঙ্কে থাকা নগরবাসী প্রয়োজনীয় ব্যাগ, শোয়ার মাদুর ও কম্বল নিয়ে রাত কাটানোর জন্য আন্ডারগ্রাউন্ড সাবওয়ে স্টেশনগুলোতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন।

ব্যাংক কর্মকর্তা ইরিনা রিবালচেঙ্কো সাবওয়ে প্ল্যাটফর্মে গাঢ় রঙের হুডি পরে এবং চারপাশে জিনিসপত্রের ব্যাগ নিয়ে বসে থাকা অবস্থায় এএফপিকে জানান, আমরা আমাদের জরুরি জিনিসপত্র গুছিয়ে সাবওয়েতে চলে এসেছি। পুরো কিয়েভ শহর এখন চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। আজ কর্মস্থলে আটকা পড়ার পর আমাদের অফিসিয়াল চ্যাট গ্রুপে এবং বসরা সবাই লাগাতার সতর্ক থাকার বার্তা পাঠাচ্ছিলেন।

ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনীর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার রাশিয়া সুপরিকল্পিতভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নজিরবিহীন আক্রমণ চালিয়ে গেছে। দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক, কিয়েভ, খারকিভ ও পোলতাভাসহ দেশের বিভিন্ন কৌশলগত অঞ্চলে অন্তত ৫০টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৩০টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে রুশ বাহিনী।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, শীতের প্রাক্কালে ইউক্রেনের জ্বালানি খাত ও বেসামরিক নাগরিক সমাজের মনোবল ভেঙে দিতেই রাশিয়া এই ধরণের সমন্বিত ও ভয়াবহ বিমান আক্রমণ বৃদ্ধি করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো মানবিক ও সামরিক সহায়তার দাবি জোরালো হচ্ছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়