অধূমপায়ীদের চেয়ে ধূমপায়ীদের পারকিনসনসের ঝুঁকি অর্ধেক কম
ফাইল ছবি
ধূমপান ক্যানসার, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের নানা জটিলতা ও অকালমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এ বিষয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোনো সংশয় নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, তামাকের কারণে প্রতিবছর ৭০ লাখের বেশি মানুষ মারা যায় এবং পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়ে আরও বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। অথচ কয়েক দশক ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি অদ্ভুত পর্যবেক্ষণ গবেষকদের ভাবিয়ে তুলেছে ধূমপায়ীদের মধ্যে পারকিনসন্স রোগের ঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় কম। এবার বৃহৎ পরিসরের একটি গবেষণায় সেই পুরোনো রহস্যের সম্ভাব্য একটি সূত্র হিসেবে সামনে এসেছে কার্বন মনোক্সাইড।
গবেষণাটি বলছে, বিষয়টি সম্ভবত ধূমপানের উপকারিতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং সিগারেটের ধোঁয়ার একটি বিষাক্ত উপাদান কার্বন মনোক্সাইড পারকিনসন্সের ঝুঁকি কমার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও সহযোগীরা চীনের বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যতথ্য ব্যবহার করে এই সম্পর্ক পরীক্ষা করেছেন। গবেষণাটি ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে জেএএমএ নিউরোলজিতে।
গবেষণায় চীন কাদুরি বায়োব্যাংকের ৫ লাখের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী মোট ৫ লাখ ১২ হাজারের বেশি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে শ্বাসে নির্গত কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। পরবর্তী প্রায় ১২ বছর ধরে তাদের স্বাস্থ্যগত তথ্য অনুসরণ করে দেখা হয় কারা পারকিনসন্সসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। বিশ্লেষণে ৫ লাখ ১২ হাজার ৭০১ জনের তথ্য ব্যবহার করা হয়; এই সময়ের মধ্যে ১ হাজার ১৩১ জনের পারকিনসন্স রোগ শনাক্ত হয় এবং আরও ২ হাজার ৯৪৯ জনের অন্যান্য নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ ধরা পড়ে।
পারকিনসন্স একটি ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়া নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ, যাতে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে চলাফেরার গতি কমে যাওয়া, হাত-পায়ে কাঁপুনি, পেশির শক্ত হয়ে যাওয়া, ভারসাম্যহীনতা ও হাঁটাচলায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর সঙ্গে ঘুমের সমস্যা, ব্যথা, মানসিক ও জ্ঞানীয় জটিলতাও যুক্ত হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ২০১৯ সালে বিশ্বজুড়ে ৮৫ লাখের বেশি মানুষ পারকিনসন্সে আক্রান্ত ছিলেন এবং গত ২৫ বছরে রোগটির বৈশ্বিক বিস্তার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে পারকিনসন্সের কারণে মৃত্যু ও প্রতিবন্ধিতার বোঝাও দ্রুত বেড়েছে।
পারকিনসন্সের কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। বয়স ও জিনগত প্রবণতার পাশাপাশি পরিবেশগত বিভিন্ন কারণও রোগটির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। কিন্তু ধূমপানের সঙ্গে পারকিনসন্সের সম্পর্কটি অন্য অনেক রোগের তুলনায় একেবারেই ব্যতিক্রম। ৫০ বছরেরও বেশি আগে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা প্রথম লক্ষ্য করেন, ধূমপায়ীদের সামগ্রিক মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি হলেও পারকিনসন্সে মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে কম। পরবর্তী কয়েক দশকের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায়ও ধূমপায়ীদের মধ্যে পারকিনসন্সের ঝুঁকি কম থাকার একই প্রবণতা পাওয়া গেছে। কিছু গবেষণায় ঝুঁকি প্রায় অর্ধেক কম বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও নতুন চীনা গবেষণায় নিয়মিত ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি প্রায় ৩০ শতাংশ কম পাওয়া গেছে।
এতদিন এই সম্পর্কের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে সিগারেটের ধোঁয়ার বিভিন্ন উপাদান নিয়ে গবেষণা হয়েছে। সিগারেটের ধোঁয়ায় হাজার হাজার রাসায়নিক ও গ্যাস থাকে। এর মধ্যে নিকোটিন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, কারণ এটি সরাসরি মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব ফেলে এবং স্নায়ুতন্ত্রের বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। কিন্তু পারকিনসন্স রোগীদের ওপর নিকোটিন প্রয়োগ করে পরিচালিত পরীক্ষায় রোগের অগ্রগতি ধীর করার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং একটি সাম্প্রতিক র্যান্ডমাইজড ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এক বছর নিকোটিন প্যাচ ব্যবহারে পারকিনসন্সের মোটর উপসর্গ বা রোগের ক্লিনিক্যাল অগ্রগতিতে উপকারের প্রমাণ মেলেনি। ফলে ধূমপান ও পারকিনসন্সের বিপরীত সম্পর্কের পেছনে নিকোটিনই মূল কারণ এমন ধারণা দুর্বল হয়েছে।
নতুন গবেষণার মূল প্রশ্ন ছিল, তাহলে সিগারেটের আর কোন উপাদান এই অস্বাভাবিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে? গবেষকেরা বিশেষভাবে নজর দেন কার্বন মনোক্সাইডের দিকে। কার্বন মনোক্সাইড হলো বর্ণহীন ও গন্ধহীন একটি গ্যাস, যা কার্বনযুক্ত জ্বালানি অসম্পূর্ণভাবে পুড়লে তৈরি হয়। সিগারেটের ধোঁয়ায় এর উপস্থিতি থাকে এবং ধূমপায়ীদের শরীরে এটি তুলনামূলকভাবে বেশি জমে। তবে কার্বন মনোক্সাইডকে সাধারণভাবে বিষাক্ত গ্যাস হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। উচ্চমাত্রায় এটি রক্তের অক্সিজেন পরিবহন ক্ষমতা ব্যাহত করে গুরুতর বিষক্রিয়া এমনকি মৃত্যুও ঘটাতে পারে। তাই গবেষণায় যে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষামূলক সম্পর্ক পাওয়া গেছে, সেটিকে কার্বন মনোক্সাইডকে নিরাপদ বা স্বাস্থ্যকর পদার্থ হিসেবে বিবেচনা করার কোনো কারণ হিসেবে দেখা যাবে না।
চীন কাদুরি বায়োব্যাংকের এই বিশাল ডেটাসেট গবেষকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ দিয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের শ্বাসে নির্গত কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা শুরুতেই মাপা হয়েছিল। আগের গবেষণাগুলোতে একই বায়োব্যাংকের তথ্য ব্যবহার করে দেখা গেছে, ধূমপায়ীদের নিঃশ্বাসে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা অধূমপায়ীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০১৩ সালের একটি গবেষণায় বর্তমান ধূমপায়ীদের মধ্যে কার্বন মনোক্সাইডের গড় মাত্রা পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রায় ১১.৫ পিপিএম এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৯.৩ পিপিএম ছিল; কখনো ধূমপান না করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে তা ছিল যথাক্রমে প্রায় ৩.৭ ও ৩.২ পিপিএম। এই মাত্রা ধূমপানের পরিমাণ, ধোঁয়া গভীরভাবে টানার অভ্যাস এবং ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণসহ বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।
নতুন গবেষণায় নিয়মিত ধূমপায়ীদের মধ্যে পারকিনসন্সের ঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম পাওয়া গেছে। গবেষণায় নিয়মিত ধূমপায়ীদের শ্বাসে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রাও বেশি ছিল। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি আসে এমন মানুষদের কাছ থেকে, যারা কখনো নিয়মিত ধূমপান করেননি। তাদের মধ্যেও যাদের নিঃশ্বাসে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল, তাদের পরবর্তী সময়ে পারকিনসন্সে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম দেখা গেছে। গবেষকেরা এই সম্পর্ককে শুধু ধূমপানের অভ্যাস দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারেননি।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গু মোকাবিলায় সারাদেশে স্বাস্থ্যসেবা জোরদার সরকারের
পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণেও বিষয়টি বেশ স্পষ্ট। কখনো ধূমপান না করা ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের নিঃশ্বাসে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা ২ পিপিএমের নিচে ছিল, তাদের তুলনায় ২ থেকে ৩ পিপিএম মাত্রায় পারকিনসন্সের ঝুঁকি প্রায় ১৫ শতাংশ কম ছিল। ৩ থেকে ৫ পিপিএম মাত্রায় ঝুঁকি প্রায় ৩৮ শতাংশ কম এবং ৫ থেকে ১১.৫ পিপিএম মাত্রায় প্রায় ৩২ শতাংশ কম পাওয়া যায়। ১১.৫ পিপিএম বা তার বেশি মাত্রাতেও ঝুঁকি প্রায় ৩৫ শতাংশ কম ছিল। অর্থাৎ, খুব সরলভাবে বলা যায় না যে কার্বন মনোক্সাইড যত বাড়ে ঝুঁকি ঠিক তত অনুপাতে কমে; তবে সামগ্রিক বিশ্লেষণে উচ্চতর নিঃশ্বাস-কার্বন মনোক্সাইড এবং কম পারকিনসন্স ঝুঁকির মধ্যে একটি শক্তিশালী বিপরীত সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই সম্পর্কটি শুধু পারকিনসন্সের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে। কখনো ধূমপান না করা ব্যক্তিদের মধ্যে উচ্চতর কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা ডিমেনশিয়ার মতো অন্যান্য নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ, ফুসফুসের ক্যানসার কিংবা অন্যান্য ধূমপান-সম্পর্কিত রোগের কম ঝুঁকির সঙ্গে একইভাবে সম্পর্কিত ছিল না। গবেষকদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে এমন সম্ভাবনা তৈরি হয় যে কার্বন মনোক্সাইডের সঙ্গে পারকিনসন্সের সম্পর্কটি সাধারণভাবে যারা তুলনামূলকভাবে সুস্থ, তাদের কার্বন মনোক্সাইড বেশি এমন কোনো সরল ব্যাখ্যা নাও হতে পারে।
তবে মানুষের শরীরে নিঃশ্বাসের সঙ্গে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড কোথা থেকে আসে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ধূমপান ছাড়াও কার্বন মনোক্সাইডের একাধিক উৎস রয়েছে। কাঠ, কয়লা, পেট্রোলসহ কার্বনযুক্ত জ্বালানি পুরোপুরি না পুড়লে কার্বন মনোক্সাইড তৈরি হয়। ফলে যানবাহনের ধোঁয়া ও বাইরের বায়ুদূষণ, ঘরের ভেতরে কাঠ বা কয়লা দিয়ে রান্না কিংবা ঘর গরম করা এবং পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শ সবই মানুষের শ্বাসে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা বাড়াতে পারে। চীন কাদুরি বায়োব্যাংকের আগের গবেষণাতেও দেখা গেছে, কখনো ধূমপান না করা মানুষের নিঃশ্বাসে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা পরোক্ষ ধূমপান ও বায়োমাস বা কয়লা পোড়ানোর সংস্পর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত।
নতুন গবেষণায় গবেষকেরা অঞ্চল, ঋতু, কঠিন জ্বালানি ব্যবহার এবং পরোক্ষ ধূমপানের মতো সম্ভাব্য প্রভাবগুলো পরিসংখ্যানগতভাবে হিসাবের মধ্যে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এসব বিষয় সমন্বয় করার পরও উচ্চতর নিঃশ্বাস- কার্বন মনোক্সাইড এবং কম পারকিনসন্স ঝুঁকির সম্পর্ক টিকে ছিল। তবে এখানেই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে শ্বাসে মাপা কার্বন মনোক্সাইডের সব উৎস নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে কোনো ব্যক্তির কার্বন মনোক্সাইড বেশি থাকার প্রধান কারণ পরিবেশ, ঘরের জ্বালানি, পরোক্ষ ধূমপান নাকি শরীরের নিজস্ব বিপাকীয় প্রক্রিয়া এই গবেষণা থেকে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
কার্বন মনোক্সাইডের একটি অভ্যন্তরীণ জৈবিক উৎসও রয়েছে। মানুষের কোষ স্বাভাবিক বিপাকীয় প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অতি সামান্য পরিমাণ কার্বন মনোক্সাইড তৈরি করে। উচ্চমাত্রার কার্বন মনোক্সাইড বিষাক্ত হলেও খুব কম মাত্রায় শরীরে এটি কিছু জৈবিক সংকেত-প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণাগার ও প্রাণীর ওপর পরিচালিত আগের কিছু গবেষণায় কম মাত্রার কার্বন মনোক্সাইড কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করা, প্রদাহ কমানো এবং রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়ায় প্রভাব রাখার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এই জৈবিক প্রভাবগুলো যদি মানুষের মস্তিষ্কেও কার্যকর হয়, তাহলে স্নায়ুকোষকে ক্ষতি ও প্রদাহ থেকে রক্ষার মাধ্যমে পারকিনসন্সের বিকাশে ভূমিকা রাখার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা তৈরি হতে পারে। তবে এটি এখনো একটি বৈজ্ঞানিক অনুমান, প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা-তথ্য নয়।
গবেষণাটির আরেকটি তাৎপর্য হলো, এটি দীর্ঘদিনের ধূমপান কি পারকিনসন্স থেকে রক্ষা করে? এই প্রশ্নটির কাঠামোটিই বদলে দিতে পারে। গবেষকেরা বলছেন, ধূমপান নিজে কোনো প্রতিরক্ষামূলক আচরণ নয়; বরং সিগারেটের ধোঁয়ার কোনো নির্দিষ্ট উপাদান এ ক্ষেত্রে কার্বন মনোক্সাইড ধূমপায়ীদের মধ্যে পারকিনসন্সের কম ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ, ভবিষ্যৎ গবেষণার লক্ষ্য হওয়া উচিত ধূমপানের ক্ষতিকর হাজারো উপাদান গ্রহণ না করেই এই সম্ভাব্য জৈবিক প্রক্রিয়াটি আলাদা করে বোঝা।
তবে গবেষণার ফলাফলকে কার্বন মনোক্সাইড পারকিনসন্স ঠেকায় এমন সিদ্ধান্তে রূপ দেওয়া যাবে না। এটি একটি prospective observational cohort study; গবেষকেরা মানুষের কার্বন মনোক্সাইড মাত্রা ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়াননি বা কমাননি। ফলে কার্বন মনোক্সাইড বেশি থাকার কারণেই পারকিনসন্স কম হয়েছে, নাকি অন্য কোনো অজানা কারণ একই সঙ্গে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা এবং পারকিনসন্সের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করেছে তা এখনো নিশ্চিত নয়। গবেষণার লেখকেরাও এ কারণে আরও বড়, সুনির্দিষ্টভাবে পরিকল্পিত মানব-পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়াতেও একই সতর্কতা উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে গবেষণাটিকে বড় পরিসরের ও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হলেও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, অংশগ্রহণকারীদের কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা ও ধূমপানের তথ্য গবেষণার শুরুতে নেওয়া হয়েছিল; পরবর্তী বছরগুলোতে তাদের পরিবেশ বা ধূমপানের অভ্যাস বদলাতে পারে। ফলে পর্যবেক্ষণমূলক সম্পর্ককে সরাসরি কারণ-ফল হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। একই সঙ্গে গবেষণাটি পারকিনসন্সের সম্ভাব্য জৈবিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন গবেষণার দরজা খুলে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
পারকিনসন্সের সম্ভাব্য চিকিৎসা হিসেবে কম মাত্রার কার্বন মনোক্সাইড ব্যবহার করা যায় কি না, সেটিও এখন গবেষণার বিষয়। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, পারকিনসন্স আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওপর কম মাত্রার কার্বন মনোক্সাইড নিয়ে একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ইতোমধ্যে চলমান। সেই পরীক্ষার ফলাফলই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে মানুষের শরীরে কার্বন মনোক্সাইডের কোনো সম্ভাব্য নিউরোপ্রটেকটিভ প্রভাব বাস্তবে রোগের উপসর্গ বা অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলে কি না এবং তা চিকিৎসায় নিরাপদভাবে ব্যবহারযোগ্য কি না, তা বোঝার জন্য।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য বার্তাটি অবশ্যই পরিষ্কার: নতুন গবেষণা ধূমপানকে কোনোভাবেই নিরাপদ বা উপকারী প্রমাণ করে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সব ধরনের তামাক ব্যবহার ক্ষতিকর এবং নিরাপদ মাত্রার তামাক-এক্সপোজার নেই। তামাক প্রায় শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং ক্যানসার, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের রোগ ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে পারকিনসন্সের সঙ্গে ধূমপানের বিপরীত সম্পর্কের বৈজ্ঞানিক রহস্য সমাধানের চেষ্টা কখনোই ধূমপান শুরু করা, ধূমপান চালিয়ে যাওয়া কিংবা ধূমপান ছাড়তে দেরি করার যৌক্তিকতা হতে পারে না।
অক্সফোর্ডের গবেষক ক্লারা বুয়েনো লোপেজ ও তার সহকর্মীদের এই গবেষণা তাই ধূমপানকে ভালো প্রমাণ করার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে সিগারেটের ক্ষতিকর ধোঁয়ার মধ্যে এমন কোনো নির্দিষ্ট জৈবিক প্রক্রিয়া আছে কি, যা আলাদা করে কাজে লাগালে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষকে পারকিনসন্সের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব? ৫ লাখের বেশি মানুষের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সেই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর হিসেবে কার্বন মনোক্সাইডকে সামনে এনেছে। কিন্তু সেই সূত্রকে চিকিৎসায় রূপ দিতে হলে পর্যবেক্ষণমূলক সম্পর্কের বাইরে গিয়ে নিয়ন্ত্রিত মানব-পরীক্ষায় এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা প্রমাণ করতে হবে। আপাতত তাই ধূমপান পারকিনসন্স কমায় নয় বরং ধূমপান ও পারকিনসন্সের দীর্ঘদিনের অদ্ভুত সম্পর্কের পেছনে কার্বন মনোক্সাইডের সম্ভাব্য ভূমিকার নতুন প্রমাণ মিলেছে এই ব্যাখ্যাই বৈজ্ঞানিকভাবে সবচেয়ে যথাযথ।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








