পূজার আগে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দেওয়ার ঘটনায় উসকানির শঙ্কা পুলিশের
ছবি: সংগৃহীত
আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তা জোরদারের মধ্যেই সেগুনবাগিচায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেয়ালচিত্রে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় চরম উদ্বেগ ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দেশের প্রধান ধর্মীয় উৎসবের আগমুহূর্তে এই কর্মকাণ্ডকে সম্ভাব্য উসকানিমূলক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
শনিবার (১০ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেয়ালচিত্রে কালি লেপনকালে এক নারীসহ চারজনকে আটক করেছে শাহবাগ থানা পুলিশ।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম (এসডিএফ)-এর সদস্যসচিব এ এন এম আয়াস। পরবর্তীতে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক চারজনকেই ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা (ডিবি) কার্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওচিত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, শনিবার দুপুরে এক নারী তুলি ও ব্রাশ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালো কালি লেপে দিতে শুরু করেন। এ সময় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য ও পথচারীরা তাকে বাধা দিলে ওই নারী ও তার সহযোগীরা হট্টগোল বাঁধায় এবং বিভিন্ন ধরনের উসকানিমূলক স্লোগান দিতে থাকে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির একপর্যায়ে পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে তাদের আটক করে টহল ভ্যানে তোলে।
আটকের পর গণমাধ্যমের সামনে ওই নারী দাবি করেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন এবং কাঙ্গালদের আবার কিসের শিক্ষা এমন বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বকবিকে বাংলাদেশের ভাবাদর্শের বিরোধী আখ্যা দিয়ে এই প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছিলেন বলে জানান। তবে পুলিশের কঠোর জেরার মুখে পরবর্তীতে তিনি নিজের বক্তব্য পরিবর্তন করেন।
ওই নারী জানান, তিনি জ্বরে আক্রান্ত এবং তাকে একটি সাধারণ প্রতিবাদ কর্মসূচির কথা বলে সেখানে আনা হয়েছিল। প্রতিকৃতিতে কালি লেপনের পূর্বপরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি অবহিত ছিলেন না বলেও দাবি করেন। একইসঙ্গে আটকের সময় এক পুরুষ পুলিশ সদস্যের ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগ তোলেন তিনি।
আরও পড়ুন: মধ্যরাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ
অন্যদিকে, সংগঠনের সদস্যসচিব আয়াশকে আটক করে ভ্যানে তোলার সময় তার সহযোগীরা পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কিতে লিপ্ত হলে এলাকায় সাময়িক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।দেয়ালচিত্রের পটভূমি ও সাম্প্রতিক বিতর্কগত ৫ অক্টোবর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) উদ্যোগে সেগুনবাগিচার ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করার পর সৌন্দর্যবর্ধন কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিল্পকলা একাডেমির সীমানাপ্রাচীরে উপমহাদেশের ১০ জন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ও গুণী ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি ও গ্রাফিতি আঁকা হয়। এই তালিকায় বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান, লালন শাহ, চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান, বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম ও অভিনেতা হুমায়ূন ফরীদির পাশাপাশি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের প্রতিকৃতিও স্থান পায়।
দেয়ালচিত্রটি উন্মোচনের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু গোষ্ঠী এটি নিয়ে সমালোচনা শুরু করে। বিশেষ করে দেশীয় ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের ব্যক্তিত্বদের স্থান দেওয়া এবং নারী ব্যক্তিত্বদের অনুপস্থিতি নিয়ে কয়েকটি সংগঠন অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছিল। সেই ধারাবাহিকতায় পূর্বঘোষিত কর্মসূচি পালনের অংশ হিসেবে শনিবার রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের ব্যানারে এই কালি লেপন ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালানো হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য ও তদন্তের নির্দেশশাহবাগ থানার কর্মকর্তা এবং ডিএমপির রমনা বিভাগের উপকমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম জানান, আসন্ন দুর্গাপূজার আগে সার্বিক শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সামাজিক উত্তেজনা প্রতিরোধের স্বার্থেই এই প্রতিরোধমূলক আটক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। আটকদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোন ধারায় বা আইনে মামলা করা হবে, তা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পর্যালোচনার পর নিশ্চিত করা হবে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি নিছক কোনো স্থানীয় প্রতিবাদ নাকি এর পেছনে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত কোনো সাম্প্রদায়িক বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে, তা খতিয়ে দেখতেই আটক চারজনকে ডিবি কার্যালয়ে গভীর জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ৬ অক্টোবর ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দীন আহমদ আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজাকে পুলিশের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে ঘোষণা করেন। পূজামণ্ডপ ও সংবেদনশীল সাংস্কৃতিক স্থানগুলোতে পোশাকধারী ও সাদা পোশাকের পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েনসহ সর্বোচ্চ স্তরের বিশেষ সতর্কতা জারি রাখা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশিষ্টজনদের প্রতিকৃতি বিকৃত করার ঘটনাটিকে প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








