প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে স্থগিত যুব উন্নয়নের নিয়োগ পরীক্ষা, ক্ষুব্ধ চাকরিপ্রার্থীরা
ছবি: সংগৃহীত
প্রশ্নপত্র ফাঁসের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং শেষ মুহূর্তের আকস্মিক সিদ্ধান্তে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীনে বহুল প্রতীক্ষিত সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা (১১তম গ্রেড) পদের নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১১টায় এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে প্রশ্নফাঁসের খবর ছড়িয়ে পড়ায় এবং পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা আসায় রাজধানীজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
দেশের দূরদূরান্ত থেকে আসা চাকরিপ্রার্থীরা মিরপুর, শাহবাগ, নীলক্ষেত, মতিঝিল, মানিক মিয়া এভিনিউ এবং ধানমন্ডিসহ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। ফলে ঢাকার বেশ কিছু প্রধান সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়ে জনদুভোগ চরমে পৌঁছায়।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১১তম গ্রেডের এই ২৪২টি শূন্য পদে অংশ নেওয়ার জন্য দেশব্যাপী ৩ লাখের অধিক চাকরিপ্রার্থী আবেদন করেছিলেন। রাজধানী ঢাকার প্রায় ১০০টি কেন্দ্রে একযোগে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষার আগের রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের জোরালো অভিযোগ ওঠে।
একটি বিশেষ পোস্টে দাবি করা হয়, নিয়োগ পরীক্ষা কমিটির দায়িত্বে থাকা নির্দিষ্ট এক কর্মকর্তা প্রশ্নফাঁস চক্রের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এমনকি এক নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে জনপ্রতি প্রায় ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে প্রশ্ন সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলেও ওই পোস্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই প্রশ্নপত্রের ছবি ও তথ্যের সঙ্গে পরীক্ষার মূল প্রশ্নের আংশিক বা পূর্ণ মিল খুঁজে পাওয়ার পরই নড়েচড়ে বসে কর্তৃপক্ষ। শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার সততা ও স্বচ্ছতা রক্ষা করতে অনিবার্য কারণে পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয় অধিদপ্তর।
সকালে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরীক্ষার্থীরা অত্যন্ত আশা নিয়ে কেন্দ্রে উপস্থিত হন। কিন্তু পরীক্ষার ঠিক আগমুহূর্তে বা প্রশ্নপত্র বিতরণের সময় কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা দিলে চাকরিপ্রার্থীদের মাঝে চরম হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থী কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে এসে সরাসরি রাজপথে নেমে পড়েন।
বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টার বেশি সময় পর্যন্ত মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজসংলগ্ন টেকনিক্যাল মোড়, মতিঝিলে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়, মানিক মিয়া এভিনিউর আড়ং মোড়, শাহবাগ মোড়, নীলক্ষেত মোড় এবং ধানমন্ডির সাতমসজিদ সড়কে অবস্থান নিয়ে তীব্র বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা।
আরও পড়ুন: লালমনিরহাটে সকালে হাঁটতে বেরিয়ে ট্রাকচাপায় প্রাণ গেল দুই নারীর
শাহবাগ ও মানিক মিয়া এভিনিউর মতো অত্যন্ত ব্যস্ততম পয়েন্টগুলোতে সড়ক অবরোধের কারণে চারপাশের প্রধান সড়কগুলোতে তীব্র যানজট ছড়িয়ে পড়ে। ধানমন্ডি থেকে শাহবাগ পর্যন্ত যাতায়াতে সাধারণ যাত্রীদের দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হয়।
বিক্ষুব্ধ প্রার্থীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়ে তারা দেশের বিভিন্ন জেলা যেমন সিলেট, চট্টগ্রাম বা মফস্বল থেকে ঢাকায় এসে নানা ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। হঠাৎ এভাবে পরীক্ষা স্থগিত করা এবং প্রশ্নফাঁসের মতো দুর্নীতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তারা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত ও অতিদ্রুত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নতুন পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার জোর দাবি জানান।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক করতে ট্রাফিক পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আন্দোলনকারীদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। দুপুর ১টার পর থেকে ধীরে ধীরে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
পরীক্ষা স্থগিতের বিষয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-৫) মোড় মাজহারুল হক গণমাধ্যমকে জানান, অনিবার্য কারণবশত এবং ওপর মহলের নির্দেশনা অনুযায়ী শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসন উইংয়ের পরিচালক ডি এম আতিকুর রহমান স্বীকার করেছেন যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নের মিল পাওয়া গেছে।
এদিকে এই পুরো ঘটনার নেপথ্য রহস্য উদঘাটন এবং দায়ীদের চিহ্নিত করতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে (প্রশাসন অনুবিভাগ) আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায় গঠিত তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। কমিটিকে আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রশ্নফাঁস চক্রের হোতাদের আইনের আওতায় আনতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) গত শুক্রবার রাত থেকেই যৌথভাবে ছায়াতদন্ত শুরু করেছে। ডিএমপির সাইবার ইউনিট ও ডিবির একাধিক দল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সূত্র ধরে মাঠে নেমেছে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, আগামী ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যেই নতুন পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হবে এবং পরীক্ষার্থীদের এই অপূরণীয় ক্ষতির পেছনে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








