আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৮:১৯, ১১ অক্টোবর ২০২৬
আপডেট: ০৮:৩১, ১১ অক্টোবর ২০২৬

রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ নিহত ১২, আহত ৩০৯

রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ নিহত ১২, আহত ৩০৯

ছবি: সংগৃহীত

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন। হামলায় বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের টার্মিনাল এলাকায় আঘাত লাগে। হতাহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং রিয়াদগামী সব ফ্লাইট অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া অথবা বাতিল করা হয়। 

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সৌদি আরবের মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে শনিবার (১০ অক্টোবর) এ হামলা ঘটে। 

রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে রিয়াদের গুরুত্বপূর্ণ এই বিমানবন্দরে এটি তৃতীয় হামলা। এর আগে হামলায় চারজন নিহত হন এবং সৌদি আরবের একটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার বিমানবন্দরে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর বিভিন্ন অংশ থেকে যাত্রীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন জানান, বিস্ফোরণের পর বিমানবন্দরের ভেতরে একাধিক ব্যক্তিকে মেঝেতে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছেন তিনি। ঘটনাস্থলের দিকে এক ডজনের বেশি অ্যাম্বুলেন্স ছুটে যেতে দেখা যায়। হামলায় আহত এক যাত্রী রয়টার্সকে জানান, বিমানবন্দরের বাইরে আকাশে একটি বস্তু উড়ে যেতে দেখার পর প্রস্থান ফটকের কাছাকাছি ভবনের ছাদের একটি অংশ ধসে পড়ে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে। এপি জানায়, হামলার পর বিমানবন্দরের প্রবেশপথগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সেখানে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো হয়। উদ্ধারকাজ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি সেবার কর্মীরা কাজ করেন।

প্রাথমিক প্রতিবেদনে বিস্ফোরণের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে পরবর্তী সময়ে সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বরাতে রয়টার্স ও এপি জানায়, হামলায় ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক ছাড়াও বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের নাগরিক রয়েছেন। হতাহতদের চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। 

এপি জানায়, বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত ৩ ও ৪ নম্বর টার্মিনালসংবলিত স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে বলে একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তবে হামলার পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও সংশ্লিষ্ট সব তথ্য যাচাইয়ের কাজ চলছিল।

রিয়াদ বিমানবন্দরের হামলায় দুজন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে ঢাকার ও রিয়াদের কূটনৈতিক সূত্র। বাংলা ট্রিবিউনের ১১ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত দুই বাংলাদেশির পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি; তাঁরা প্রবাসী কর্মী, নাকি ওমরাহযাত্রী ছিলেন, সেটিও তখন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। 

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, রিয়াদ থেকে জেদ্দাগামী ৪১ জন বাংলাদেশি ওমরাহযাত্রীর একটি দল বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন। তারা ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের জামিয়া আরাবিয়া রবিউল উলুম মাদ্রাসার শিক্ষক বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ওই দলের সঙ্গে হতাহতদের সম্পর্ক এবং নিখোঁজের বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যের পূর্ণাঙ্গ সরকারি নিশ্চিতকরণ তখনও পাওয়া যায়নি। ফলে নিহত দুই বাংলাদেশির পরিচয়, তাদের পরিবারের কাছে খবর পৌঁছানো এবং আহত বা নিখোঁজ বাংলাদেশিদের সর্বশেষ অবস্থা নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশি নাগরিকদের হতাহতের তথ্য সামনে আসায় সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসী, তাদের স্বজন এবং ওমরাহযাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হামলার পর কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদগামী উড়োজাহাজগুলো অন্য বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়া হয় অথবা ফ্লাইট বাতিল করা হয়। একপর্যায়ে বিমানবন্দরের ওপর একটি হেলিকপ্টারকে চক্কর দিতে দেখা যায়। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের সরাসরি সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেয়। একই সঙ্গে নিশ্চিত তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোও নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় রিয়াদগামী ও রিয়াদ থেকে ছেড়ে আসা ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করে। ইতিহাদ এয়ারওয়েজ ও কাতার এয়ারওয়েজ তাদের নিজ নিজ কেন্দ্রীয় বিমানবন্দর থেকে রিয়াদে চলাচলকারী একাধিক ফ্লাইট বাতিল করে; বাতিলের কিছু সিদ্ধান্ত সোমবার পর্যন্ত কার্যকর রাখার কথা জানানো হয়। কুয়েত এয়ারওয়েজও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে সৌদি রাজধানীর সঙ্গে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখে। 

এ ছাড়া এপি জানায়, এর আগেই এয়ার ইন্ডিয়া, ফ্লাইদুবাই, লুফথানসা গ্রুপ ও পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস রিয়াদসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট স্থগিত করেছিল। ফলে শুধু রিয়াদগামী যাত্রীরাই নন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রুটে সংযোগকারী ফ্লাইট ব্যবহার করা যাত্রীরাও ভ্রমণসূচি পরিবর্তন ও দীর্ঘ বিলম্বের মুখে পড়তে পারেন।

বাংলাদেশের যাত্রীদের জন্যও ফ্লাইট স্থগিতের প্রভাব পড়েছে। বিডিনিউজ২৪ ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিমানবন্দরে বিস্ফোরণের পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের নির্ধারিত বিজি৩৩৯ ও বিজি৩৪০ ফ্লাইট পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করে। 

শনিবার রাতে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি যাত্রীদের বিমানবন্দরে না যাওয়ার পরামর্শ দেয় এবং ফ্লাইট পুনর্নির্ধারণ বা পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য জানানোর কথা জানায়। যাত্রীদের হালনাগাদ তথ্যের জন্য বিমানের দাপ্তরিক ওয়েবসাইট ও অন্যান্য যোগাযোগমাধ্যম অনুসরণ করতে বলা হয়। এ পরিস্থিতিতে যাত্রীদের টিকিটের সময়সূচি, সংযোগকারী ফ্লাইট এবং ফেরার যাত্রার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার কাছ থেকে সরাসরি নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

রিয়াদ বিমানবন্দরে শনিবারের প্রাণঘাতী হামলার আগে চলতি সপ্তাহে আরও দুটি হামলার ঘটনা ঘটে। 

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের হামলাগুলোতে চারজন নিহত হন এবং সৌদি আরবের জাতীয় বিমান সংস্থা সৌদিয়ার একটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

এপি জানায়, বৃহস্পতিবারের হামলায় তিনজন সৌদি নাগরিক নিহত হন, যাদের মধ্যে একজন পাইলট ছিলেন। বিমানটি মাটিতে অবস্থানকালে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাতে কোনো যাত্রী ছিলেন না বলে সৌদি জাতীয় বিমান সংস্থা জানিয়েছে। অন্য হামলাটিতেও প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে। ধারাবাহিক এসব হামলা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক বিমান চলাচল অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

শনিবারের হামলার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট হুতিদের দায়ী করে কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এপির প্রতিবেদনে জোটের পক্ষ থেকে হামলাটিকে গুরুতর যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বর্ণনা করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বিমানবন্দরে সামরিক স্থাপনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। হামলার সময় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেন হামলা ঠেকাতে পারেনি এবং বেসামরিক বিমান চলাচলের স্থাপনায় নিরাপত্তা কীভাবে আরও জোরদার করা হবে এসব বিষয় এখন সৌদি কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

হামলার পেছনে রয়েছে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর মধ্যে নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠা সামরিক সংঘাত। হুতিরা দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে পরিস্থিতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উত্তেজনা আবার বাড়তে থাকে। 

আরও পড়ুন: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির হুঁশিয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রকে রেজায়ি

রয়টার্স ও এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী চলতি সপ্তাহে হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করার পর সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। এর আগে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের এলাকায় হুতিদের অগ্রগতি এবং ইয়েমেনের বিভিন্ন স্থানে পাল্টাপাল্টি হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। সৌদি আরবও হুতিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে। 

হুতিদের দাবি, এসব অভিযানে বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ হতাহত হয়েছেন; তাদের এসব দাবির সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এ পরিস্থিতিতে হুতিরা সৌদি আরবের আকাশসীমাকে সামরিক অভিযানের এলাকা ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোকে সেখানে চলাচল না করার সতর্কতা দিয়েছে। হুতিদের বক্তব্য, সৌদি আরব-সমর্থিত বাহিনীর অভিযানের জবাবেই তারা এ অবস্থান নিয়েছে। 

অন্যদিকে, সৌদি আরব ও তার মিত্ররা হুতিদের হামলাকে বেসামরিক জনগণ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখছে। ফলে সামরিক সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক কূটনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ছে।

রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কি না, তা বিবেচনা করা হচ্ছে। হামলার বিষয়ে জানানোর পর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। 

এপি জানায়, ট্রাম্প পরে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনার কথাও জানান। তবে হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করেছে এমন কোনো ঘোষণা তখন দেওয়া হয়নি।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এ ধরনের আক্রমণ নিরীহ মানুষের জীবনের প্রতি স্পষ্ট অবজ্ঞা প্রকাশ করে। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটও পাল্টা পদক্ষেপের অঙ্গীকার করেছে। একই সময়ে রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস তাদের নাগরিকদের বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাসহ কয়েকটি দেশও নাগরিকদের বিমানবন্দর এলাকায় না যাওয়ার সতর্কতা জারি করে বলে এপি জানিয়েছে।

এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের এভিয়েশন সেফটি এজেন্সি সৌদি আকাশসীমা নিয়ে সতর্কতা সম্প্রসারণ করে। সংস্থাটির মূল্যায়নে, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এবং সেগুলো প্রতিহত করার সামরিক তৎপরতার কারণে বেসামরিক উড়োজাহাজকে ভুলবশত সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে শনাক্ত করার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এই সতর্কতা আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান বিমান চলাচলকেন্দ্র এবং দেশটির বিমানবন্দরগুলো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রিয়াদ বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলার সময়েই সৌদি আরবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছিল। ১১ থেকে ১৫ অক্টোবর বিশ্ব পেট্রোলিয়াম কংগ্রেসের জ্বালানিবিষয়ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া চলতি মাসের শেষ দিকে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এফআইআই) সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারক, সরকারি প্রতিনিধি, বিনিয়োগকারী ও বড় প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের অংশ নেওয়ার কথা। সৌদি আরবের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টায় এ আয়োজনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার মধ্যেও সম্মেলনগুলোর আয়োজকেরা নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা জানিয়েছেন এবং অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন। তবে ফ্লাইট বাতিল, বিকল্প পথে যাতায়াত, নিরাপত্তা সতর্কতা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার বিদেশি অতিথিদের অংশগ্রহণে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতি নির্ভর করছে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হওয়া এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে তার ওপর। এসব আয়োজন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা সৌদি আরবের জন্য কেবল কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক বিষয় নয়; বরং দেশটির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও জড়িত।

সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির বিমানবন্দর, তেল অবকাঠামো ও সামরিক স্থাপনাগুলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক হামলাগুলো তাই শুধু বিমানবন্দরের যাত্রী ও কর্মীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিমান চলাচলের ধারাবাহিকতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি খাতের কার্যক্রম এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা। 

এপির প্রতিবেদনে আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, সৌদি আরব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত নিয়ে চাপের মুখে রয়েছে এবং কয়েকটি মিত্র দেশের কাছে আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা চেয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব দেশের আনুষ্ঠানিক অবস্থান একভাবে প্রকাশিত হয়নি।

সৌদি কর্তৃপক্ষ চলতি সপ্তাহে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার দৃশ্য, সেগুলোর আঘাতস্থল কিংবা এ-সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য ধারণ ও প্রকাশের বিষয়ে জনসাধারণকে সতর্ক করেছে। এসব তথ্য প্রকাশ করলে আইনি জটিলতায় পড়তে হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে হামলার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, বিমানবন্দরের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, আহতদের চিকিৎসা এবং বিমান চলাচল পুনরায় চালুর বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে।

রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বেসামরিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলা, পাল্টা সামরিক অভিযানের হুঁশিয়ারি এবং আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর ফ্লাইট স্থগিতের ঘটনা পরিস্থিতির ব্যাপ্তি স্পষ্ট করছে। একই সঙ্গে নিহতদের মধ্যে দুই বাংলাদেশি থাকায় ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্যও বিশেষ উদ্বেগের। আহতদের চিকিৎসা, নিহতদের পরিচয় নিশ্চিতকরণ, স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিমান চলাচল কখন পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে এবং সৌদি আরব-হুতি সংঘাত আরও বিস্তৃত হবে কি না, তা নির্ভর করছে পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ ও কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়