আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১০:২৮, ১১ অক্টোবর ২০২৬
আপডেট: ১০:৩৩, ১১ অক্টোবর ২০২৬

রিয়াদে হামলার জেরে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে পারে যুক্তরাষ্ট্র

রিয়াদে হামলার জেরে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে পারে যুক্তরাষ্ট্র

ফাইল ছবি

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কৌশলগত কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ফের চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে চালিত সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এই রক্তক্ষয়ী হামলার কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার জোরালো ইঙ্গিত দিয়েছে। একইসঙ্গে লোহিত সাগরের কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার এবং হুতিদের চূড়ান্ত দমনে লক্ষাধিক সেনার সমন্বয়ে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব।

শনিবার (১০ অক্টোবর) রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালিত ওই হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে। 

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিশ্চিত করেছেন যে, এই বর্বরোচিত হামলায় একজন আমেরিকান নাগরিকও প্রাণ হারিয়েছেন। বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরেই রিয়াদ এবং আবহা বিমানবন্দরের মতো বেসামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে একের পর এক হামলা চালিয়ে আসছিল বিদ্রোহীরা। সর্বশেষ এই হামলার পর সৌদি-নেতৃত্বাধীন যৌথ সামরিক জোট ঘটনাটিকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাপরাধ হিসেবে অভিহিত করে কঠোর ও চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

এদিকে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, বেসামরিক জনগণের ওপর এ ধরনের আক্রমণ আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং তা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। 

জাতিসংঘের ইয়েমেন বিষয়ক বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছেন যে, বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর এই হামলাগুলো আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে এবং ইয়েমেনের ভঙ্গুর শান্তি প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলছে। পাকিস্তানসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মহল থেকেও সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ সমর্থনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

রিয়াদে বিমানবন্দর হামলার খবর পাওয়ার পরপরই জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের এই আক্রমণকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেন। 

তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, হুতিদের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ অত্যন্ত খারাপ এবং হুথিদের দমনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক পদক্ষেপে অংশ নিতে পারে। পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একইসঙ্গে তিনি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে জরুরি ফোনালাপের মাধ্যমে পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোচনার পরিকল্পনা করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথগুলোর নির্বিঘ্ন বাণিজ্যিক চলাচল বজায় রাখতে ওয়াশিংটন পর্দার আড়ালে বা প্রত্যক্ষভাবে গোয়েন্দা ও সামরিক সহায়তা আরও বাড়াতে পারে। ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি অভিযানকে লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ, সামরিক পরামর্শ ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করে আসছে। এছাড়া পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো দীর্ঘদিনের মিত্ররাও বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা পাঠিয়ে সৌদি আরবকে কৌশলগত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ নিহত ১২, আহত ৩০৯

আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, হুতিদের বিরুদ্ধে আসন্ন সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ তথা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির উপকূলীয় এলাকার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বিঘ্নিত হওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতিতে বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই প্রণালির ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তারা বড় ধরনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে, যা কোনোভাবেই মেনে নিতে নারাজ রিয়াদ। ফলস্বরূপ, হুতিদের সঙ্গে নতুন করে কোনো শান্তি আলোচনায় বসার আগে তাদের সামরিকভাবে হটিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে চায় সৌদি আরব।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে প্রকাশ, সম্ভাব্য এই অভিযানের জন্য দুটি প্রধান পরিকল্পনা বিবেচনা করছে সৌদি সামরিক নেতৃত্ব। প্রথম বিকল্পটি হলো বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে সীমিত পরিসরে ঝটিকা সামরিক অভিযান চালিয়ে উপকূলীয় এলাকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেওয়া। দ্বিতীয় বিকল্পটি হলো ইয়েমেনের একাধিক রণাঙ্গনে একযোগে সমন্বিত আক্রমণ পরিচালনা করা, যার মধ্যে আল-বাইদা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফ গভর্নরেট অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। অভিযানের পরিধি ও রূপরেক্ষার ওপর ভিত্তি করে এতে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর এক লাখের বেশি প্রশিক্ষিত সেনা অংশ নিতে পারেন। স্থলভাগে ইয়েমেনি সেনারা অগ্রাভিযান চালালেও তাদের সর্বাত্মক বিমান ও লজিস্টিক সহায়তা দেবে সৌদি বিমানবাহিনী।

ইয়েমেনে ২০১৪ সালে হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করার পর থেকেই দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ চলছে। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহাল করতে সৌদি জোট সামরিক হস্তক্ষেপ করলেও সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় রূপ নেয়। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও চলতি বছরের জুলাই মাসে তা পুরোপুরি ভেঙে যায়। এরপর থেকেই দেশটিতে নতুন করে সর্বাত্মক সংঘাত শুরু হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে হুতিরা পশ্চিম ইয়েমেনের মোখা বন্দরনগরী এবং বাব আল-মান্দেব সংলগ্ন কয়েকটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিলে সংঘর্ষের পারদ আরও চড়ে যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নাজিলি দাবি করেছেন যে, সাম্প্রতিক ২৪ ঘণ্টার লড়াইয়ে প্রায় ৫০০টি সামরিক অভিযানে ১ হাজার ৫৪০ জন বিদ্রোহী নিহত বা আহত হয়েছেন। বিশেষ করে তাইজ গভর্নরেট নতুন করে শুরু হওয়া ভয়াবহ লড়াইয়ের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সেখানে হুতিদের তীব্র অগ্রযাত্রা প্রতিহত করতে সরকারি বাহিনী তাইজের কৌশলগত আল-হুবান ক্রসিং সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। দীর্ঘ ৯ বছর বন্ধ থাকার পর মানবিক কারণে ২০২৪ সালে ক্রসিংটি খুলে দেওয়া হয়েছিল, তবে হুতিদের সশস্ত্র অনুপ্রবেশ ও সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে এই কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে সৌদি আরবের এই বড় আকারের স্থল অভিযান পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। ইয়েমেনের হুতিবিরোধী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়ের অভাব এবং রাজনৈতিক মতভেদ দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাছাড়া হুতিদের গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং সৌদি তেল ও বেসামরিক অবকাঠামোতে তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে নতুন এক সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তবে সৌদি নেতৃত্ব যদি এই সামরিক পদক্ষেপে সফল হয়, তবে তা কেবল লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক পথকেই সুরক্ষা দেবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূরাজনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্যে এক সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়