রাজবাড়ীতে নৌকা বাইচের ফাইনালে সংঘর্ষ ও নৌকাডুবি, আহত ২০
ছবি: সংগৃহীত
রাজবাড়ীর গোদারবাজার সংলগ্ন পদ্মা নদীতে ৩ দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার ফাইনাল চলাকালে দুই নৌকার মাঝিমাল্লাদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ ও নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে। এতে বিজয়ী হওয়ার দ্বারপ্রান্তে থাকা নৌকার অন্তত ২০ জন মাঝিমাল্লা পিটিয়ে ও ধাক্কা দিয়ে আহত করা হয়েছে। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ও বাইচের বাকি আয়োজন স্থগিত ঘোষণা করে আয়োজক কমিটি।
গত শনিবার (১০ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজবাড়ী সদর উপজেলার উড়াকান্দা ও লালগোলা এলাকার মাঝামাঝি পদ্মার বুকে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গ্রাম-বাংলার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এবং যুবসমাজকে মাদকমুক্ত রাখার লক্ষ্যে গত বৃহস্পতিবার (০৮ অক্টোবর) রাজবাড়ীর গোদারবাজার এলাকায় তিন দিনব্যাপী এই নৌকা বাইচের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। প্রতিযোগিতার শেষ দিন শনিবারে ফাইনাল রাউন্ডে মুখোমুখি হয় পাবনার আমিনপুর থানার নিউ শাড়িরভিটা ও কুষ্টিয়ার নিউ জনতা সংগ্রাম নামের দুটি প্রনামিক নৌকা।
ফাইনাল বাইচটি যখন শেষ পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন ৮০ জনের বহর নিয়ে নিউ শাড়িরভিটা নৌকাটি প্রতিযোগিতায় স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। পেছনে পড়ে যাওয়া মেনে নিতে না পেরে নিউ জনতা সংগ্রাম নৌকার মাঝিমাল্লা ও কৌশলীরা বেপরোয়াভাবে এগিয়ে থাকা 'নিউ শাড়িরভিটা'র ওপর তাদের নৌকাটি তুলে দেয় এবং সজোরে ধাক্কা মারে। এতে মুহূর্তের মধ্যেই নিউ শাড়িরভিটা নৌকাটি পদ্মায় তলিয়ে যায় এবং মাঝিমাল্লা ও চালকরা পানিতে পড়ে যান।
দুর্ঘটনায় কূল হারানোর পর অভিযোগ ওঠে আরও বর্বর আচরণের। নিউ শাড়িরভিটা নৌকার মাঝিমাল্লা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেন, পানিতে ডুবে জীবন বাঁচানোর আকুতি জানাতে থাকা মানুষের ওপর নিউ জনতা সংগ্রাম নৌকার লোকজন বাঁশ, লাঠি, লগি ও বৈঠা দিয়ে উপর্যুপরি হামলা ও আঘাত চালায়। এতে পানিতে ভাসমান অনেকেই গুরুতর রক্তাক্ত হন।
নৌকাটির দলনেতা তৈয়ব আলী তপন ও মাঝি শাহিন শেখ জানান, আমরা জয়ের শেষ সীমানায় ছিলাম। ডান পাশ থেকে অন্য নৌকাটি আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে নৌকাটি ডুবিয়ে দেয়। এরপর তারা বাঁশ ও লাঠিসোঁটা দিয়ে আমাদের মারধর করতে থাকে।
আরও পড়ুন: খুলনায় রাতে একা চলাচলে পুলিশ সদস্যদের নিষেধাজ্ঞা
ঘটনার পরপরই বাইচের সুরক্ষায় পেছনে থাকা দৌলতদিয়া নৌ পুলিশ, জেলা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় আয়োজক কমিটির সদস্যরা উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। নৌ পুলিশের স্পিডবোট, ফায়ার সার্ভিসের টিম এবং স্থানীয় উদ্ধারকারী ট্রলারের সহায়তায় নদী থেকে দ্রুত প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ জন মাঝিমাল্লাকে নিরাপদে তীরে তোলা হয়।
আহতদের দ্রুত রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাত পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসা নেওয়া আহতদের মধ্যে রয়েছেন পাবনা আমিনপুরের আমজাদ শেখের ছেলে রাকিব (১৭), আবুল হোসেনের ছেলে রওশন (৪০), রওশন শেখের ছেলে মাসুদ শেখ (৩০), ইউসুফ শেখের ছেলে শাহিন শেখ (৩৫), আব্দুল আজিজ শেখের ছেলে সুজাত শেখ (২৬), হারুন সরদারের ছেলে লতিফ সরদার (৩৫), সোবহান শেখের ছেলে শরিফ শেখ (৩০), আক্কাস আলীর ছেলে সাদ্দাম (৩৭), বাবলু (৪০), ইসরাফিল (৪৭), জাহাঙ্গীরের ছেলে হাবিব (২৫), সফি শেখের ছেলে কায়েস (১৮) এবং রাজবাড়ীর কালুখালীর মৃগী এলাকার আকবর শেখের ছেলে আলাউদ্দিন (৩৫) ও শফিকুল ইসলাম (৪৪)। এদের মধ্যে ১৪ জন প্রাথমিক চিকিৎসা নিলেও ৩ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. তমাল জানান, আহতদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে লাঠি ও বৈঠার আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। কারও মাথায়, হাতে আবার কারও শরীরে কাটা জখম পাওয়া গেছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া রোগীদের মধ্যে কেউ আশঙ্কামুক্ত না হলেও দ্রুত চিকিৎসায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নৌকা বাইচ ও গ্রামীণ সংস্কৃতি উদযাপন পরিষদ-এর সদস্য মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, সারাক্ষণ বেশ আনন্দমুখর পরিবেশেই বাইচ চলছিল। কিন্তু ফাইনাল টানের শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে পড়া নৌকার লোকজন ইচ্ছাকৃতভাবে নিউ শাড়িরভিটা নৌকার ওপর হামলা চালায়। এ ঘটনায় আমাদের কমিটির ৪ জনসহ মোট ১৭ জন আহত হয়েছেন। তাৎক্ষণিকভাবে আহতদের চিকিৎসার সার্বিক ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং আপাতত বাইচ ও পুরস্কার বিতরণী কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে।
দৌলতদিয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ত্রিনাথ সাহা জানান, বাইচ শুরুর পর থেকেই দুর্ঘটনা এড়াতে নৌ পুলিশ সতর্কাবস্থায় ছিল। সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের সদস্যরা উদ্ধার কাজ পরিচালনা করে নদী থেকে প্রায় ৮০ জনকে উদ্ধার করতে সক্ষম হন। এ ঘটনায় এই মুহূর্তে নদী বা লোকালয়ে কেউ নিখোঁজ নেই বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ঘটনাস্থলে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করায় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ এড়াতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। শৃঙ্খলাভঙ্গ ও হামলার ঘটনাটি তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








