News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:৪৩, ২০ এপ্রিল ২০২৬

ফিরছে ‘সুপার এল নিনো’: হুমকির মুখে বৈশ্বিক জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য

ফিরছে ‘সুপার এল নিনো’: হুমকির মুখে বৈশ্বিক জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য

ছবি: নিউজবাংলাদেশ

দীর্ঘদিনের প্রচলিত একটি বৈজ্ঞানিক ধারণা ছিল যে, এল নিনো ধীরে ধীরে তার শক্তি হারাচ্ছে এবং প্রকৃতির ওপর এর প্রভাব ম্লান হয়ে আসছে। কিন্তু ২০২৪ সালের বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিস্থিতি সেই ধারণাকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। 

বিজ্ঞানীরা দেখছেন, এল নিনো কেবল সক্রিয়ই নয়, বরং এটি বর্তমানে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। 

কম্পিউটার মডেলগুলোর সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী জুলাই-আগস্টের মধ্যেই প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পুনরায় শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, যা রূপ নিতে পারে ‘সুপার এল নিনো’তে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) জানিয়েছে, এই ভয়াবহ রূপান্তরের সম্ভাবনা প্রায় ২৫ শতাংশ, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে চরম আবহাওয়ার শঙ্কা জাগিয়ে তুলছে।

বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের বাইরে ছিল না। ২০২৪ সালে টানা ৩৬ দিন ধরে দেশজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ রেকর্ড করা হয়, যেখানে তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করেছে। দীর্ঘস্থায়ী এই পরিস্থিতি শুধু দৈনন্দিন জীবনকে অস্বস্তিকর করেনি, বরং কৃষি উৎপাদন, জনস্বাস্থ্য এবং নগর ব্যবস্থার ওপরও গভীর চাপ সৃষ্টি করেছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের দীর্ঘ তাপপ্রবাহ বৈশ্বিক উষ্ণতা ও এল নিনো–সংশ্লিষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনেরই একটি আঞ্চলিক প্রতিফলন।

আন্তর্জাতিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্ব আবারও নতুন একটি এল নিনো পর্যায়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA) জানিয়েছে, জুলাই–আগস্টের মধ্যে এল নিনো পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে কিছু জলবায়ু মডেল এটিকে ‘সুপার এল নিনো’তে রূপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও এই সম্ভাবনার হার তুলনামূলকভাবে সীমিত, তবে জলবায়ু বিজ্ঞানীদের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বর্তমানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ডের কাছাকাছি অবস্থান করছে। সমুদ্রের এই অতিরিক্ত উষ্ণতা এল নিনো সক্রিয় হওয়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে, কারণ সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এই জলবায়ু চক্রকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের মার্চ মাসেই সমুদ্রের তাপমাত্রা প্রায় রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যা ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমানে সক্রিয় শীতল লা নিনা ধীরে ধীরে নিরপেক্ষ অবস্থায় যাচ্ছে এবং চলতি বছরের শেষ দিকে এল নিনোতে রূপান্তরের সম্ভাবনা রয়েছে। এই পরিবর্তন বৈশ্বিক আবহাওয়ার ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। একইসঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলে সমুদ্রের বরফের বিস্তারও গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্রতা আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

আরও পড়ুন: দেশে ৭০ সালের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাবে শীত

যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক সময়ে রেকর্ড করা আবহাওয়াগত তথ্যও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। ১৮৫০ সাল থেকে আবহাওয়া রেকর্ড সংরক্ষণের ইতিহাসে ২০২৪ সালের মার্চ মাস ছিল গত ১৩২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণ মাসগুলোর একটি। 

গবেষণা সংস্থা ক্লাইমেট সেন্ট্রাল-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় এমন তাপমাত্রা দেখা গেছে যা মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া ব্যাখ্যা করা কঠিন। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরই প্রমাণ।

জলবায়ু বিজ্ঞানে এল নিনো ও লা নিনা প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের বিপরীতধর্মী দুইটি স্বাভাবিক চক্র হিসেবে পরিচিত। লা নিনা অবস্থায় শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহের কারণে সমুদ্রের উষ্ণ পানি পশ্চিম দিকে সরে গিয়ে পূর্বাঞ্চল তুলনামূলকভাবে শীতল থাকে। বিপরীতে এল নিনো সক্রিয় হলে এই বায়ুপ্রবাহের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে সমুদ্রের পানি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে বৃষ্টিপাত, খরা, ঘূর্ণিঝড় এবং তাপমাত্রার ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়।

সমুদ্র উষ্ণ হলে তার প্রভাব শুধু জলপৃষ্ঠেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে পানির প্রসারণ ঘটে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ে। একইসঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলন ত্বরান্বিত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ায়। এর পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় ও অতিবৃষ্টির মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনাও বৃদ্ধি পায়, যার ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা ও খরার ঝুঁকি আরও তীব্র হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এল নিনো সাধারণত বর্ষার মাঝামাঝি বা শেষের দিকে সক্রিয় হতে পারে, ফলে প্রাথমিকভাবে মৌসুমি বৃষ্টিপাতে বড় ধরনের ব্যাঘাত না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন, এল নিনো শক্তিশালী হলে মে-জুন থেকেই তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাতের ধরণে পরিবর্তন শুরু হতে পারে, যার ফলে ঘন ঘন তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে এবং কৃষি উৎপাদনে চাপ বাড়তে পারে।

সবশেষে জলবায়ু বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এল নিনো সাধারণত ২ থেকে ৩ মাস সক্রিয় থাকলেও এর প্রভাব কখনো কখনো ৬ থেকে ১০ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা ইতোমধ্যে শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ১.৩ থেকে ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ ঝুঁকি আরও বাড়ছে। ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বর্তমান প্রবণতা সেই লক্ষ্য অর্জনকে আরও কঠিন করে তুলছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়