যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় স্বর্ণের বাজারে বড় উত্থান
ফাইল ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত নিরসনে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণায় বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আকস্মিক পদক্ষেপে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের দাম আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বুধবার (২২ এপ্রিল) গ্রিনিচ মান সময় ভোর ৪টা ৩৫ মিনিটে আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম আউন্সপ্রতি ০.৯ শতাংশ বেড়ে ৪,৭৫৪.৮৯ ডলারে স্থির হয়।
গত মঙ্গলবার যা ১৩ এপ্রিলের পর সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল, একদিনের ব্যবধানেই তা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে জুন ডেলিভারির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ড ফিউচার ১.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে আউন্সপ্রতি ৪,৭৭২.৬০ ডলারে পৌঁছেছে। স্বর্ণের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও। রুপা বা স্পট সিলভার ১.৭ শতাংশ বেড়ে আউন্সপ্রতি ৭৭.৯৭ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। এছাড়া প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দামও গড়ে প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাজার পরিস্থিতির এই নাটকীয় পরিবর্তনের মূলে রয়েছে হোয়াইট হাউসের সাম্প্রতিক ঘোষণা।
মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, শান্তি আলোচনার পথ সুগম করতে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানো হবে। যদিও এই ঘোষণায় ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র ইসরায়েলের চূড়ান্ত সম্মতি রয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই বিশ্ববাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। যুদ্ধবিরতির প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম কমায় উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির শঙ্কা কিছুটা কমিয়ে এনেছে। তবে তেলের দাম কমলেও ডলারের মান কিছুটা শিথিল হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা আবারও নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন।
আরও পড়ুন: ডলারের দাপটে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের বড় দরপতন
মেরেক্স-এর প্রখ্যাত বাজার বিশ্লেষক এডওয়ার্ড মেইর পরিস্থিতির ব্যাখ্যায় বলেন, বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে সংঘাতের অবসান আশা করছেন, যা শেয়ার বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে যদি কোনো কারণে এই যুদ্ধবিরতি ভেঙে পুনরায় সংঘাত শুরু হয়, তবে ডলারের মান, তেলের দাম এবং সুদের হার সবই একযোগে বৃদ্ধি পাবে। এমন পরিস্থিতি স্বর্ণের বাজারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে, বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বাজারে তারল্য প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে স্বর্ণের দাম বর্তমানে ওঠানামা করছে। যদিও বর্তমান ঊর্ধ্বগতিকে কিছুটা ‘নাজুক’ বলে অভিহিত করা হয়েছে এবং স্বল্পমেয়াদে সংশোধনের (Correction) ঝুঁকি রয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে মূল্যবান ধাতুর বাজার নতুন কোনো উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে তারা পূর্বাভাস দিয়েছে।
অর্থনৈতিক এই ডামাডোলের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও শুরু হয়েছে নতুন মেরুকরণ। ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী প্রধান হিসেবে মনোনীত কেভিন ওয়ারশ মার্কিন সিনেটকে আশ্বস্ত করেছেন যে, তিনি কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করবেন না।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সুদের হার কমানো নিয়ে কোনো পূর্ব-প্রতিশ্রুতি দেননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীন সত্তা বজায় রাখাই হবে তার অগ্রাধিকার।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ। যদি যুদ্ধবিরতি স্থায়ী রূপ পায়, তবে তেলের বাজার স্থিতিশীল হবে। কিন্তু সংঘাতের ছায়া দীর্ঘায়িত হলে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণ ও ডলারের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়ে উঠবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








