চাঁপাইনবাবগঞ্জে একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণে লন্ডভন্ড বসতবাড়ি
ছবি: সংগৃহীত
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার পদ্মা নদীর দুর্গম চরাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী নারায়ণপুর ইউনিয়নে একটি সেমিপাকা বসতবাড়িতে ভয়াবহ ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টার দিকে নারায়ণপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জহুরপুর নরোশিয়া (মুসা মাওলানা পাড়া) গ্রামে এ বিস্ফোরণ ঘটে।
মাটির নিচে ও ঘরের ভেতরে মজুত রাখা বিপুলসংখ্যক ককটেল একযোগে বিস্ফোরিত হওয়ায় পুরো বাড়ি লন্ডভন্ড হয়ে গেছে; উড়ে গেছে ঘরের টিনের চাল এবং ধসে পড়েছে ইট-সিমেন্টের দেয়াল। বিকট শব্দের এই বিস্ফোরণে পুরো সীমান্ত এলাকা কেঁপে ওঠে এবং চরাঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
তবে সৌভাগ্যবশত ঘটনাটিতে কোনো প্রাণহানি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। বিস্ফোরণের পরই ঘরের বাসিন্দারা আত্মগোপনে চলে যায় এবং পুলিশ এসে বাড়িটি তালাবদ্ধ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পায়।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার রাত ৮টার দিকে হঠাৎ করেই পর পর একাধিক ও একযোগে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসে। আকস্মিক বিস্ফোরণে আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে হুড়োহুড়ি ও আতঙ্ক তৈরি হয়। ঘরের ভেতরে মাটির নিচে বা খাটের নিচে মেঝের ভেতর বিশেষ প্রক্রিয়ায় পুঁতে ও লুকিয়ে রাখা ককটেলগুলো বিস্ফোরিত হলে সেমিপাকা ভবনটি বিধ্বস্ত হয়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় টিনের চালা বহু দূরে ছিটকে পড়ে ও ইটের দেয়াল ভেঙে যায়। তবে এতে নতুন করে কোনো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি।
বিস্ফোরিত ককটেলের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, বাড়িটিতে অর্ধশতাধিক ককটেল মজুত ছিল এবং তার প্রায় সবই বিস্ফোরিত হয়েছে।
অন্য একাধিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি শক্তিশালী ককটেল একসাথে ফুটে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। তবে সুনির্দিষ্টভাবে ঠিক কতটি ককটেল সেখানে ছিল, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
স্থানীয় তথ্য ও প্রাথমিক প্রশাসনিক তদন্তে জানা গেছে, যে বসতবাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটেছে তা ওই গ্রামের মো. ইসহাক আলীর ছেলে মো. এহু হোসেনের (৪৭) সেমিপাকা বাড়ি। তবে স্থানীয় সূত্র ও কিছু প্রতিবেদনে ইউনূস আলীর ছেলে ইয়াহিয়ার নামও উঠে এসেছে, যিনি এই চক্রের সাথে সম্পৃক্ত বা যৌথভাবে ওই বাড়িটি ব্যবহার করতেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠ থেকে ২০ ককটেল ও পেট্রোল বোমা উদ্ধার
বিস্ফোরণের নেপথ্য কারণ হিসেবে স্থানীয় রাজনীতির চেয়ে আধিপত্য বিস্তার ও জলাশয় দখলকেই মূল কারণ মনে করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। নারায়ণপুর ইউপি চেয়ারম্যান নাজির হোসেন ও ওয়ার্ড সদস্য (মেম্বার) মো. রবু জানান, নদীর চরাঞ্চলের জোহরপুর মাঠপাড়া কালভার্টসংলগ্ন একটি খাঁড়ি (ক্যানাল/নালা) কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা চলছিল। ভারতের বিল থেকে পানি নামার এই পথটিতে বর্ষা মৌসুমে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। এই মাছ ধরার অধিকার ও খাঁড়ি দখল নিয়ে 'আব্দুর রশীদ কালু' এবং 'বাঘা-এহু' গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
ইউপি চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন, এলাকাটিতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও সহিংসতার আশঙ্কায় বিস্ফোরণের আগের দিন অর্থাৎ রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কাছে একটি লিখিত প্রতিবেদন ও অভিযোগও জমা দেওয়া হয়েছিল। ওই অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বা আধিপত্য ধরে রাখতেই ককটেলগুলো জমা করা হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
রাজনৈতিক কোন্দল না থাকলেও স্থানীয়দের অন্য একটি অংশের মতে, সামনে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন্দ্র করে সীমান্তবর্তী চরাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা নাশকতার জন্য এই বিপুল বিস্ফোরক মজুত করা হয়ে থাকতে পারে। আবার ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় সীমান্ত পারাপার ও দেশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর কাজে সরবরাহের উদ্দেশ্য ছিল কি না, সে দিকটিও পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো খতিয়ে দেখছে।
ঘটনার পর সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিজিবি) ও থানা পুলিশ দ্রুত তৎপর হয়। বিজিবি ৫৩ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক জানান, জহুরপুর বিজিবি ক্যাম্প থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে ঘটনাটি ঘটে। খব পাওয়া মাত্রই বিজিবির টহল দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং ওই সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করতে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়। বর্তমানে চরাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানান তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. একরামুল হোসাইন জানান, পদ্মা নদী পার হয়ে দুর্গম চরে রাতে পুলিশ পৌঁছানোর পর মঙ্গলবার সকাল থেকে সার্বিক তদন্ত কাজ জোরদার করা হয়েছে। মাটির নিচে বিস্ফোরক পুঁতে রাখার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ককটেলগুলোর উৎস কোথায়, কীভাবে সীমান্ত এলাকা দিয়ে তা আনা হলো এবং এর পেছনে বাঘা, কালু বা এহুসহ আর কারা জড়িত রয়েছে তা বের করতে যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








