আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৭:০৩, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের বিমান আটকে দেওয়ার কারণ জানাল পাকিস্তান

বাংলাদেশের বিমান আটকে দেওয়ার কারণ জানাল পাকিস্তান

ছবি: নিউজবাংলাদেশ (এআই)

রাশিয়া থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ইউরেনিয়াম বহনকারী যে চালানটি গত ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা ছিল, সেটি নির্ধারিত সময়ে আসতে পারেনি পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায়। ঘটনাটি নিয়ে প্রথমদিকে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে পাকিস্তানের অনুমতি না পাওয়ার বিষয়টি সামনে এলেও কেন অনুমতি দেওয়া হয়নি, তা স্পষ্ট ছিল না। 

একদিন পর ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশন এক বিবৃতিতে বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে জানিয়েছে, এটি কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; ফ্লাইটের রুট নির্ধারণ এবং আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি-সংক্রান্ত কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বিষয়টি সম্পর্কিত। 

একই সময়ে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটম জানিয়েছে, রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ইউরেনিয়াম সরবরাহ অক্টোবর থেকে আবার শুরু হবে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে নির্ধারিত সরবরাহ কার্যক্রম শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম ২৮ সেপ্টেম্বর এএনআইকে জানিয়েছিলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ইউরেনিয়াম বহনকারী একটি কার্গো বিমান ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু বিমানটি পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে জ্বালানি বাংলাদেশে আসেনি। তখন পাকিস্তান কেন অনুমতি দেয়নি, সে বিষয়ে বাংলাদেশের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল না বলে তিনি জানান। 

মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার পক্ষ থেকে পরে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে নতুন করে চালান পাঠানোর সময়সূচি জানানো হয়।

রূপপুর প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসার নির্ধারিত বিমানপথে একাধিক দেশের আকাশসীমা ব্যবহার করতে হয়। 

সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, পরিকল্পিত রুটে কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, পাকিস্তান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের কথা ছিল বিমানের। পাকিস্তানের ওভারফ্লাইট ক্লিয়ারেন্স না মেলায় নির্ধারিত ফ্লাইটটি এগোতে পারেনি। 

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সদস্য হাসিনুর রহমানও জানান, রাশিয়ার পক্ষ থেকে চালান স্থগিত হওয়ার কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

তবে ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় দেওয়া বিবৃতিতে পাকিস্তান হাইকমিশন ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। তাদের ভাষ্য, পাকিস্তান আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতিনীতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং কূটনৈতিক ফ্লাইট ও আকাশসীমা অতিক্রমের অনুমতির সব আবেদন দেশটির প্রতিষ্ঠিত নিয়ন্ত্রণমূলক নির্দেশিকা ও বেসামরিক বিমান চলাচল-সংক্রান্ত প্রটোকল অনুসারে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করা হয়। রূপপুরের জ্বালানি পরিবহন নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে যে ঘটনার কথা বলা হয়েছে, তা মূলত ফ্লাইটের রুট ও আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি-সংক্রান্ত কারিগরি এবং পদ্ধতিগত ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জানিয়েছে হাইকমিশন। এ ধরনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে এবং তার ফলে ফ্লাইটের সময়সূচিতে পরিবর্তন বা সমন্বয় ঘটতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

পাকিস্তান একই বিবৃতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে বিষয়টিকে যথাযথ কারিগরি প্রেক্ষাপটে দেখার আহ্বান জানিয়েছে। 

হাইকমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, এমন কোনো প্রতিবেদন বা বয়ানকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়, যার মাধ্যমে ঘটনাটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে যে বিষয়টি পাকিস্তানের আকাশসীমার অনুমতি না পাওয়া হিসেবে সামনে এসেছিল, ইসলামাবাদ পরবর্তী ব্যাখ্যায় সেটিকে রাজনৈতিক অবস্থান বা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে বিমান চলাচল-সংক্রান্ত কারিগরি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

এই পরিস্থিতিতে রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনের নতুন সূচিও সামনে এসেছে। রোসাটম জানিয়েছে, দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে এবং বছরের শেষ নাগাদ সরবরাহ কার্যক্রম সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরো সরবরাহ কার্যক্রমে একাধিক চার্টার্ড ফ্লাইট ব্যবহার করা হবে। একটি প্রতিবেদনে মোট সাতটি চার্টার্ড ফ্লাইটে দ্বিতীয় ইউনিটের ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি পরিবহনের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: মদ্যপ অবস্থায় ফ্লাইট চালাতে গিয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার পাইলট আটক

এর ফলে ২৪ সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত চালানটি পুরো প্রকল্পের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা নয়; বরং নির্ধারিত সময়ের একটি চালান পিছিয়ে গিয়ে নতুন সময়সূচিতে সরবরাহ অব্যাহত রাখার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। 

রোসাটমের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পের জ্বালানি সরবরাহ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে চালু থাকবে। বাংলাদেশের কর্মকর্তারাও নতুন সময়সূচিতে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে চালান আসার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন।

রূপপুরের জ্বালানি পরিবহনের এই সাময়িক জটিলতার গুরুত্ব বুঝতে হলে প্রকল্পটির বর্তমান পর্যায়ও বিবেচনায় নিতে হয়। পাবনার ঈশ্বরদীর পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে তৃতীয় প্রজন্মের প্লাস (Generation III+) প্রযুক্তির দুটি VVER-1200 রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট; দুটি ইউনিট চালু হলে মোট উৎপাদনক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটম প্রকল্পটির সাধারণ নকশা ও নির্মাণকাজে যুক্ত এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন প্রকল্পটির তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

রূপপুরের প্রথম ইউনিট ইতোমধ্যে কমিশনিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টরে তাজা পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শুরু হয়। পরে ১২ মে জানানো হয়, ইউনিট-১-এর রিঅ্যাক্টর কোরে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি পর্যায়ক্রমে লোড করা সম্পন্ন হয়েছে। এরপর রিঅ্যাক্টরকে ন্যূনতম নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতায় নেওয়া, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কমিশনিং প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপগুলো শুরু হয়।

রূপপুরের প্রথম ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহের অভিজ্ঞতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালের অক্টোবরে রাশিয়া থেকে প্রথম ইউনিটের জন্য নিম্নসমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জ্বালানির প্রথম চালান বাংলাদেশে আসে। রোসাটমের নভোসিবিরস্ক কেমিক্যাল কনসেনট্রেটস প্ল্যান্টে প্রস্তুত ফুয়েল অ্যাসেম্বলি রুশ কার্গো বিমানে করে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আনা হয়েছিল। এরপর বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে এসব পারমাণবিক জ্বালানি রূপপুর প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তখন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দায়িত্ব পালন করেন।

রূপপুরের জ্বালানি পরিবহন সাধারণ পণ্য পরিবহনের মতো নয়। পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা বিধি, প্যাকেজিং, রুট অনুমোদন, আকাশসীমা ব্যবহারের ছাড়পত্র এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয় সবগুলো বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হয়। ফলে নির্ধারিত রুটের কোনো একটি দেশের ওভারফ্লাইট অনুমোদন না পাওয়া পুরো ফ্লাইট পরিকল্পনাকে পরিবর্তন করতে পারে। বর্তমান ঘটনাতেও মূলত এই রুট-নির্ভর পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যেই জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি পক্ষের বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে।

রূপপুর প্রকল্পের আর্থিক ও কৌশলগত গুরুত্বও কম নয়। প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে সম্মিলিতভাবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হবে। প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর বর্তমানে কমিশনিং ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছে প্রকল্পটি। দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ সেই ইউনিটের কমিশনিং প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এদিকে ২৪ সেপ্টেম্বরের চালান আটকে যাওয়ার ঘটনায় প্রকল্পের নির্ধারিত জ্বালানি সরবরাহ কার্যক্রমে সাময়িক পরিবর্তন এলেও রোসাটমের সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী সরবরাহ অক্টোবর থেকে পুনরায় শুরু হওয়ার কথা। ডিসেম্বরের মধ্যে সব নির্ধারিত চালান সম্পন্ন করার পরিকল্পনা থাকায় এখন মূল নজর থাকবে নতুন ফ্লাইটসূচি, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি এবং নির্ধারিত সময়ে পারমাণবিক জ্বালানি বাংলাদেশে পৌঁছানোর ওপর। পাকিস্তান তাদের অবস্থানকে কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করায় ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও নতুন পরিবহনসূচিই এখন বাস্তব অগ্রগতির প্রধান সূচক হয়ে উঠেছে।

রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন এবং দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ শুরু হওয়ার প্রক্রিয়া দুই ঘটনাই বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির কমিশনিং পর্যায়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে তৈরি হওয়া আকাশসীমা-সংক্রান্ত জটিলতা মূলত একটি নির্ধারিত জ্বালানি চালানের সময়সূচি পরিবর্তন করেছে; নতুন সূচি অনুযায়ী অক্টোবর থেকে সরবরাহ পুনরায় শুরু হলে দ্বিতীয় ইউনিটের কমিশনিং প্রস্তুতিও পূর্বপরিকল্পিত কাঠামোয় এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়