রাজধানীর স্কুলে শাস্তির নামে শিশু নির্যাতন, শনাক্ত হলেও ব্যবস্থা নেই
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর নয়াপল্টন এলাকায় একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ৩-৪ বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থীকে শাস্তির নামে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার একটি সিসিটিভি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
গত রবিবার (১৮ জানুয়ারি) দুপুর দুপুর ১২টা ৫১ মিনিটে নয়াপল্টনের ‘শারমিন একাডেমি’তে এই ঘটনা ঘটলেও বুধবার (২১ জানুয়ারি) সিসিটিভি ফুটেজটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
ভিডিওতে দেখা যায়, স্কুল ইউনিফর্ম পরা শিশুটিকে টানা-হেঁচড়ে একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গোলাপি রঙের শাড়ি পরিহিত এক নারী শিশুটিকে টেবিলের সামনে বসিয়ে বারবার চড় মারছেন ও ধমক দিচ্ছেন। এক পর্যায়ে এক পুরুষ শিক্ষক স্ট্যাপলার হাতে শিশুটির মুখের দিকে এগিয়ে গিয়ে হুমকি দেন। পুরো সময়জুড়ে শিশুটির মধ্যে চরম ভয়, কান্না ও মানসিক আতঙ্কের দৃশ্য স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
অন্য একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, চশমা পরা, ঘি রঙের প্যান্ট ও ছাঁই রঙের টি-শার্ট পরিহিত এক ব্যক্তি শিশুটিকে বেধড়ক মারধর করছেন। এ সময় পাশে গোলাপি শাড়ি পরা এক নারী শিশুটির হাত চেপে ধরে রাখেন। কিছুক্ষণ পরপর ওই ব্যক্তি এসে শিশুটিকে আঘাত করতে থাকেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর বুধবার (২১ জানুয়ারি) ফেসবুকজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
পুলিশ জানায়, ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর ঘটনাস্থল শনাক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ঘটনাটি নয়াপল্টন এলাকার ‘শারমিন একাডেমি’ নামের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘটেছে। এ ঘটনায় স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা ও কয়েকজন শিক্ষককে থানায় হাজির হতে বলা হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়েও তারা থানায় না এসে বারবার সময় নিচ্ছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তফা কামাল খান বলেন, ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। তদন্তে নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক শারমিন আক্তার। সংশ্লিষ্টদের থানায় আসার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়নি।
দেখুন: রাজধানীর শারমিন একাডেমি নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতন
এ ঘটনায় শিশু নির্যাতনের ভয়াবহতা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকারকর্মী ও শিশু অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শাস্তির নামে এ ধরনের সহিংস আচরণ শিশুদের শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর মানসিক ট্রমা তৈরি করে।
অলাভজনক প্রতিষ্ঠান পথের স্কুলের সংগঠক ও শিশু অধিকারকর্মী উম্মে সালমা আক্তার ঊর্মি বলেন, একজন শিশু সম্পূর্ণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর নির্ভরশীল। তাদের ভুলের জন্য শারীরিক শাস্তি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এতে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যারা এমন আচরণ করে, তাদের প্রথমে কাউন্সেলিং প্রয়োজন, আর তাতে কাজ না হলে আইনের যথার্থ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ নাগরিকের আইনের সমতা, জীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি শিশু আইন, ২০১৩ এবং জাতীয় শিশু নীতি, ২০১১ অনুযায়ী শিশুদের প্রতি সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি না দেওয়ার বিষয়ে হাইকোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (CRC)-এর ১৯ ও ২৮ অনুচ্ছেদও শিশুদের সহিংসতা ও নিষ্ঠুর আচরণ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে।
মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর সম্পাদক ও পরিচালক নাসিরউদ্দিন এলান বলেন, কোনো মানুষকেই আঘাত করা যাবে না। শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে শিশুদের সঠিক পথে আনা সম্ভব নয়। এ ধরনের ঘটনাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার হুসাইন মো. ফারাবী জানান, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য শোনা হয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে। তবে তারা কোনো মামলা বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দিতে সম্মত হননি। পরিবার চাইলে আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে মামলা গ্রহণ করা হবে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ভাইরাল না হলে শিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। এতে বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হয় এবং অনেক সময় নির্যাতনকারীরা পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর তৎপরতা জরুরি।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








