নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২১:৩৮, ২৪ মে ২০২৬

ঈদের আগে রেমিট্যান্সের বড় লাফ, ২৩ দিনে এলো ৩ বিলিয়ন ডলার

ঈদের আগে রেমিট্যান্সের বড় লাফ, ২৩ দিনে এলো ৩ বিলিয়ন ডলার

ফাইল ছবি

পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিতে উৎসবের আমেজ ও বড় ধরনের স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। প্রতি বছরের মতো এবারও কোরবানির ঈদে পরিবার-পরিজনের বাড়তি খরচ ও পশু কেনার চাহিদা মেটাতে প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ অর্থ পাঠাচ্ছেন। এর সুবাদে চলতি মে মাসজুড়েই বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহে এক অভূতপূর্ব চাঙ্গা ভাব বা শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি মে মাসের প্রথম ২৩ দিনেই দেশে প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে এবং বর্তমান ডলার সংকট কাটাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

রবিবার (২৪ মে) বিকেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান মে মাসের রেমিট্যান্স প্রবাহের এই হালনাগাদ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মে মাসের ১ থেকে ২৩ তারিখ পর্যন্ত সময়ে বৈধ পথে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২৯৭ কোটি ৬০ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৬ হাজার ৫৩১ কোটি ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা (মতান্তরে প্রায় ৩৬ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা)। গত ২০২৫ সালের মে মাসের প্রথম ২৩ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২১০ কোটি ৬ লাখ ডলার (মতান্তরে ২১০ কোটি ৬০ লাখ ২০ হাজার ডলার)। সেই তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে ৪১ দশমিক ৩১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে শুধু মে মাসের এই ২৩ দিনেই দেশে অতিরিক্ত প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ৮৭ কোটি ডলারের বেশি। এর মধ্যে সবশেষ ২৩ মে (শনিবার) একদিনেই প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ১৭ কোটি ৩৬ লাখ মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ১৩১ কোটি ৪৩ লাখ ১০ হাজার টাকা।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহে এই শক্তিশালী ও ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ২৩ মে পর্যন্ত (অর্থবছরের ১০ মাস ২৩ দিনে) দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ২৩০ কোটি ৯০ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার বা ৩২ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছিলেন ২ হাজার ৬৬৪ কোটি ৩৪ লাখ ২০ হাজার ডলার বা ২৬ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাব অনুযায়ী, বিগত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের এই সময়ে রেমিট্যান্সের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ২৬ শতাংশ।

আরও পড়ুন: ৩৪.৫৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাল রিজার্ভ

সাম্প্রতিক মাসগুলোর রেমিট্যান্স চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশে ধারাবাহিকভাবেই প্রবাসী আয়ের ঊর্ধ্বগতি বজায় রয়েছে। মে মাসের এই জোয়ারের আগে, সদ্য সমাপ্ত এপ্রিল মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার। তারও আগে গত মার্চ মাসে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একক মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহের সর্বকালীন রেকর্ড। এছাড়া দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের মার্চ মাসে, যার পরিমাণ ছিল ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ডলার। একই বছরের ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স আসার মাধ্যমে তা তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রবাহ হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়। আর চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দেশে আগত ৩১৭ কোটি ডলারের রেমিট্যান্সকে দেশের ইতিহাসে চতুর্থ সর্বোচ্চ মাসিক রেমিট্যান্স প্রবাহ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা রেমিট্যান্সের এই অভাবনীয় ও রেকর্ড ভাঙা প্রবৃদ্ধির পেছনে বেশ কয়েকটি যৌক্তিক ও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করেছেন। সাধারণ সময়ে রোজা বা দুই ঈদকে কেন্দ্র করে প্রবাসীদের বেশি অর্থ পাঠানোর স্বাভাবিক প্রবণতা থাকলেও, এবার তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি। 

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হুন্ডির মতো অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ পরিহার করে প্রবাসীরা যাতে বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠান, সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ ও বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপের আধুনিকায়ন, ডিজিটাল রেমিট্যান্স সেবা এবং তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারের কাছে টাকা পৌঁছে দেওয়ার মতো উন্নত ব্যাংকিং সুবিধার কারণে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের প্রতি প্রবাসীদের আস্থা ও আগ্রহ বহুগুণ বেড়েছে।

এর বাইরেও একটি বিশেষ বৈশ্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবারের রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের সবচেয়ে বড় ও প্রধান উৎস হলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এই অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে প্রবাসীরা তাদের কঠোর পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গচ্ছিত বা বিনিয়োগ না করে, নিজেদের মাতৃভূমিতে পরিবারের কাছে দ্রুত পাঠিয়ে দেওয়াকে অনেক বেশি নিরাপদ মনে করছেন। উৎসবের আমেজ ও এই নিরাপত্তা ভাবনার যৌথ প্রভাবেই মূলত চলতি মাসে রেমিট্যান্সের এই বিশাল জোয়ার তৈরি হয়েছে। 

সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, কোরবানির ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, মে মাসের শেষ সপ্তাহে বৈধ পথে প্রবাসী আয়ের এই প্রবাহ আরও বেগবান হবে এবং মাস শেষে তা একটি নতুন মাইলফলক স্পর্শ করতে পারে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়