বিশ্ববাজারে টানা দরপতন: দেশে স্বর্ণের দাম কমল ভরিতে ২১৫৮ টাকা
ফাইল ছবি
আন্তর্জাতিক বাজারে টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো মূল্যবান ধাতু স্বর্ণের মূল্যে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। বিশ্ববাজারের এই মন্দাভাব এবং স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) দাম কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বাজারেও স্বর্ণের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।
সর্বশেষ শনিবার (২৩ মে) এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ভরিতে সর্বোচ্চ ২ হাজার ১৫৮ টাকা পর্যন্ত কমিয়ে মূল্যবান এই ধাতুর নতুন দাম নির্ধারণ করেছে সংগঠনটি, যা আজ রবিবার (২৪ মে) থেকে সারা দেশে কার্যকর হয়েছে। তবে স্বর্ণের দাম কমলেও দেশের বাজারে রুপার দাম অপরিবর্তিত রেখেছে বাজুস। বিশ্ববাজারে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কায় এই দরপতন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশে আজ রোববার থেকে নতুন মূল্যে স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে।
নতুন দাম অনুযায়ী, সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম ২ হাজার ১৫৮ টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯৬৩ টাকায়। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ ২ লাখ ২৫ হাজার ২৩২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৯৩ হাজার ৩৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণ ১ লাখ ৫৭ হাজার ২৩১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এর আগে, মাত্র দুদিন আগে গত ২১ মে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়িয়েছিল বাজুস। সে সময় ভরিতে ২ হাজার ১৫৮ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ১২১ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেট ২ লাখ ২৭ হাজার ৩৩১ টাকা, ১৮ ক্যারেট ১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৪৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের ভরি ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৮৯ টাকা করা হয়েছিল।
বাজুসের তথ্যমতে, চলতি ২০২৬ বছরে এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে মোট ৬৮ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩৬ বার দাম বাড়ানো হয়েছে এবং কমানো হয়েছে ৩২ বার। এর আগে, বিগত ২০২৫ সালে দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল, যেখানে ৬৪ বার দাম বৃদ্ধি ও ২৯ বার দাম কমানোর রেকর্ড রয়েছে।
স্বর্ণের দামে বড় ধরনের কাটছাঁট করা হলেও দেশের বাজারে রুপার দাম আগের অবস্থানেই স্থিতিশীল রেখেছে বাজুস। নতুন সমন্বয় না হওয়ায় আগের নির্ধারিত দামেই বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের রুপা। বাজারে বর্তমানে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা ৫ হাজার ৬৫৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৫ হাজার ৩৬৫ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৪ হাজার ৬০৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপা ৩ হাজার ৪৪১ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ডলারের দাপটে বিশ্ববাজারে কমলো স্বর্ণের দাম
চলতি বছরে দেশের বাজারে এখন পর্যন্ত রুপার দাম মোট ৩৯ বার সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ২১ বার দাম বেড়েছে এবং বাকি ১৮ বার দাম কমেছে। অন্যদিকে, বিগত ২০২৫ সালে রুপার বাজার তুলনামূলকভাবে কম অস্থির ছিল। সেই বছর মোট ১৩ বার রুপার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল, যার মধ্যে ১০ বার দাম বৃদ্ধির বিপরীতে কমেছিল মাত্র ৩ বার।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো বড় ধরনের দরপতনের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক স্পট গোল্ডের দাম সর্বশেষ কার্যদিবসে (শুক্রবার, ২২ মে) ০.৬ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪,৫১৫.৮৩ ডলারে নেমে এসেছে, যা দিনের শুরুতে প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। সপ্তাহজুড়ে স্পট গোল্ডের সামগ্রিক দরপতন হয়েছে প্রায় ০.৪ শতাংশ। একই সঙ্গে আগামী জুনে সরবরাহের চুক্তিতে মার্কিন স্বর্ণের ফিউচার মূল্য ০.৪ শতাংশ হ্রাস পেয়ে প্রতি আউন্স ৪,৫২৩.২০ ডলারে থিতু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতির উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আর এই লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) সুদের হার আরও বাড়াতে পারে এমন গুঞ্জনই স্বর্ণের বাজারে এই মন্দাভাব তৈরি করেছে।
সিএমই গ্রুপের ‘ফেডওয়াচ’ টুলের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ অন্তত ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদের হার বাড়াতে পারে বলে ৫৮ শতাংশ ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী ধারণা করছেন। এমনকি ফেড গভর্নর ক্রিস্টোফার ওয়ালার, যিনি এতদিন সুদের হার কমানোর পক্ষে ছিলেন, তিনিও এখন পরিস্থিতি বিবেচনায় সুদের হার বাড়ানোর পথ খোলা রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন।
বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান স্টোনএক্স-এর বিশ্লেষক রোনা ও'কানেল জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালির চলমান অস্থিরতা এবং এর ফলে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ার শঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা চরম বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা কোনো ফলপ্রসূ রূপ না নেওয়ায় অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সময়ে মার্কিন ১০ বছর মেয়াদী ট্রেজারি বন্ডের মুনাফা (ইল্ড) গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরের কাছাকাছি পৌঁছেছে। সাধারণত বন্ডের মুনাফা বাড়লে স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্পট গোল্ডের মূল্যে।
স্বর্ণের পাশাপাশি বিশ্ববাজারে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামেও বড় পতন হয়েছে এবং প্রতিটি ধাতুর জন্যই সপ্তাহটি লোকসানি হিসেবে শেষ হয়েছে। স্পট সিলভার বা রূপার দাম বিশ্ববাজারে ১.১ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৭৫.৮৫ ডলারে নেমেছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে প্ল্যাটিনামের দাম ২.৫ শতাংশ কমে ১,৯১৬.৬২ ডলার এবং প্যালাডিয়ামের দাম ২.১ শতাংশ কমে ১,৩৪৯.৩০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকা গ্যাসোলিনের দাম ও মে মাসে গ্রাহকদের আস্থা রেকর্ড পরিমাণ নিচে নেমে যাওয়াও এই বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








