News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৮:৪৮, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আপডেট: ০৮:৫১, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

নির্বাচনি বিধিমালায় ৯৬ ঘণ্টা লেনদেন সীমিত, নগদ সংকটে জনভোগান্তি

নির্বাচনি বিধিমালায় ৯৬ ঘণ্টা লেনদেন সীমিত, নগদ সংকটে জনভোগান্তি

ফাইল ছবি

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ‘নিরাপত্তা’ এবং অবৈধ অর্থের প্রবাহ ঠেকানোর যুক্তিতে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং লেনদেনে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গত সোমবার (০৯ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাত ১২টা থেকে কার্যকর হওয়া এই নির্দেশনার ফলে বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো সেবায় ক্যাশ-ইন এবং ক্যাশ-আউট সুবিধা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ছন্দপতন ঘটেছে; নগদ টাকার ওপর হঠাৎ নির্ভরতা বেড়ে গিয়ে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অনলাইন উদ্যোক্তা এবং দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল পেশাজীবীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত টানা ৯৬ ঘণ্টা এই বিধিনিষেধ বলবৎ থাকবে। এ সময় গ্রাহকরা সীমিত কিছু সেবা ব্যবহার করতে পারলেও ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউটের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নির্বাচনি সময়ে অবৈধ অর্থের প্রবাহ ও ভোট কেনাবেচা ঠেকাতে সব ধরনের ব্যক্তিগত এমএফএস অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা জমা ও নগদ উত্তোলন সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে। ফলে কোনো এজেন্ট পয়েন্ট থেকে গ্রাহকরা তাদের হিসাবে টাকা জমা দিতে বা নগদ তুলতে পারছেন না। এর প্রতিফলন হিসেবে বিভিন্ন এমএফএস অ্যাপে ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউট অপশন নিষ্ক্রিয় বা ভিন্ন রঙে দেখা যাচ্ছে।

জরুরি প্রয়োজনে ‘সেন্ড মানি’ সুবিধা চালু থাকলেও সেখানে কড়া সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। একজন গ্রাহক একবারে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা পাঠাতে পারবেন এবং দিনে সর্বোচ্চ ১০ বার লেনদেন করা যাবে। অর্থাৎ দিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকার বেশি পাঠানো সম্ভব নয়। তবে বাস্তবে অনেক গ্রাহক এই সীমার মধ্যেও বারবার ‘লেনদেন ব্যর্থ’ বার্তার মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেন পুরোপুরি বন্ধ থাকায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এই নিষেধাজ্ঞা ঘিরে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। 

ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা রিকশাচালক আলাউদ্দিন বলেন, ভোট কাকে দেব, সেটা পরে। আগে তো আমার মেয়ের ওষুধ দরকার। ৮০০ টাকা পাঠাতে পারিনি—এটাই এখন সবচেয়ে বড় নিরাপত্তাহীনতা। 

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রেহানা বেগমের ভাষ্য, মোবাইল ব্যাংকিং বন্ধ, ইন্টারনেট ব্যাংকিংও বন্ধ। পাইকার টাকা না পেয়ে মাল দিচ্ছে না। নির্বাচন কি শুধু বড় লোকের জন্য?

রাজধানীর জগন্নাথপুরের আব্দুল আজিজ সড়কে বিকাশ থেকে টাকা তুলতে এসে বিপাকে পড়েন গার্মেন্টসকর্মী আলাউদ্দিন শেখ। 

তিনি বলেন, সরকার এই কাজটা ঠিক করেনি। বিকাশ থেকে টাকা তুলতে না পারলে আমি গ্রামে যাব কীভাবে? ভোটের জন্য ছুটি দেওয়া হয়েছে; কিন্তু ভোটই দিতে পারব না। 

তিনি জানান, ক্যাশ আউট বন্ধ থাকার বিষয়টি আগে জানতেন না। বাসের টিকিট কাটার মতো নগদ টাকা হাতে না থাকায় সমস্যায় পড়েছেন।

তিনি আরও বলেন, দোকানদার বলছে এক হাজার টাকা সেন্ড মানি করা যাবে; কিন্তু এতে খরচ পড়ছে ৩০ টাকা। আগে এক হাজার টাকা পাঠাতে লাগত মাত্র পাঁচ টাকা। এখন কোম্পানি আর এজেন্ট মিলে ৩০ টাকা নিচ্ছে। আমার মতো সাধারণ মানুষই সব সময় বলির পাঁঠা হয়।

আরও পড়ুন: নির্বাচন উপলক্ষে ১১-১২ ফেব্রুয়ারি সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ

যে এজেন্টের দোকানে তিনি টাকা তুলতে এসেছিলেন, সেই এজেন্ট জানান, আমাদেরও কিছু করার নেই। কোম্পানি এক হাজার টাকা সেন্ড করতে ১০ টাকা নিচ্ছে। আবার এই টাকা তুলতে গেলে ২০ টাকা খরচ হয়। তাই আমরা অতিরিক্ত ২০ টাকা নিচ্ছি। এতে গ্রাহকের মোট খরচ হচ্ছে ৩০ টাকা। শুধু গ্রাহক নয়, আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। লেনদেন বন্ধ থাকলে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার টাকা করে লোকসান হচ্ছে।

মতিঝিল এলাকার দোকানদার কোরবান আলী বলেন, ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউটের ব্যবসা ৯০ শতাংশ কমে গেছে। আমার দোকানে বেশির ভাগ মানুষই টাকা তুলতে আসতেন। এখন নিষেধাজ্ঞার কারণে মাত্র এক হাজার টাকা সেন্ড করার সুযোগ আছে, তা-ও খরচ বেশি। তাই গ্রাহকও কমে গেছে।

এদিকে নগদের সংকটে রাজধানীর বিভিন্ন এটিএম বুথের সামনে দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। বিশেষ করে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বুথগুলোতে তুলনামূলক বেশি ভিড় লক্ষ করা যায়, কারণ বিকাশের ক্যাশ আউট সেবা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। চাপের কারণে কোথাও কোথাও বুথে টাকাও শেষ হয়ে যাচ্ছে।

ইসলামী ব্যাংকের মতিঝিল লোকাল অফিসের ব্যবস্থাপক শহিদুল ইসলাম বলেন, গতকাল থেকে এটিএম বুথে টাকা তোলার চাপ কিছুটা বেড়েছে। টাকা শেষ হলে দ্রুত পুনরায় সরবরাহ করা হচ্ছে। এটিএম থেকে টাকা তোলায় কোনো নতুন সীমা দেওয়া হয়নি; গ্রাহকরা প্রয়োজনমতো তুলতে পারছেন।

ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি হিসেবে টাকা স্থানান্তর বন্ধ থাকলেও বাণিজ্যিক লেনদেন চালু রয়েছে। পাশাপাশি এটিএম বুথে পর্যাপ্ত টাকা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এমএফএস ও ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশের আওতাধীন আইবিএফটির মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেনের অপব্যবহার রোধে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে এমএফএস প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোকে নির্বাচন কমিশন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে বলা হয়েছে।

তবে সমন্বয়হীন বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। এমএফএস খাতের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় নিয়ন্ত্রণ এসেছে ঠিকই, কিন্তু মাঠপর্যায়ে কোন সেবা কীভাবে চালু থাকবে এ নিয়ে স্পষ্টতা নেই। এর চাপটা গিয়ে পড়ছে সাধারণ গ্রাহকের ওপর।

অর্থনীতিবিদদের মতে, নির্বাচনকালীন সতর্কতা প্রয়োজন হলেও তা যদি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন হয়, তাহলে জনভোগান্তি বাড়ে। 

তাদের ভাষায়, ডিজিটাল বাংলাদেশে হঠাৎ করে ডিজিটাল লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া মানে মানুষকে জোর করে নগদ অর্থনীতিতে ঠেলে দেওয়া।

তবে ভোগান্তি কমাতে মোবাইল রিচার্জ, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির বিল পরিশোধ এবং কেনাকাটার অর্থ পরিশোধ স্বাভাবিক রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব ক্ষেত্রে নতুন কোনো সীমা আরোপ করা হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফি এবং সরকারি জরুরি সেবার ফি পরিশোধও আগের মতোই চালু রয়েছে।

নির্বাচনকালীন এই বিধিনিষেধের মেয়াদ শেষ হবে ১২ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে। এরপর সব ধরনের এমএফএস ও ব্যাংকিং সেবা আবার আগের মতো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার কথা রয়েছে। সাময়িক এই অসুবিধার জন্য বিভিন্ন এমএফএস প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ জানিয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়