কর না বাড়িয়ে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন বাড়বে মূল্যস্ফীতি: গভর্নর
ফাইল ছবি
রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি না করে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের ব্যাংক ঋণের বোঝা পুনরায় বৃদ্ধি পাবে এবং তা দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
সোমবার (০৯ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন মেয়াদের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে তিনি এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে ডেপুটি গভর্নর ম. হাবিবুর রহমান, নুরুন নাহার এবং নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ খানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিশ্চিতে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের সংশোধনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, যা করা গেলে ব্যাংক লুটপাটের ঝুঁকি হ্রাস পেত এবং সুশাসন টেকসই হতো। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে তিনি ব্যাংক কোম্পানি অর্ডিন্যান্সসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আইন সংশোধনের প্রস্তাব পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের কাছে রেখে যাওয়ার কথা জানান।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আর্থিক খাতের সংস্কারে সচেষ্ট থাকবে।
মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে গভর্নর জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আস্থার অভাবে প্রত্যাশার তুলনায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে। সরকার বাজেটে কাটছাঁট করার পরও ব্যাংকখাত থেকে ঋণের হার বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন প্রয়োজন। সব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো বাংলাদেশ ব্যাংককেও চাপের মধ্যে থাকতে হয়। আশা করি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে আর্থিক খাত নিয়ে সংস্কারের বিষয়ে দলগুলো কথা রাখবে।
ড. আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরে বাজার থেকে চার বিলিয়ন ডলার কেনা হয়েছে, তবে কোনো ডলার রিজার্ভ থেকে বিক্রি করা হয়নি।
আরও পড়ুন: নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করল বাংলাদেশ ব্যাংক
তিনি বলেন, চার বছরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) যে ঋণ প্রদানের কথা ছিল, তার চেয়ে বেশি ডলার রিজার্ভে কেনা হয়েছে। অন্যের মুখাপেক্ষী থাকার কোনো ইচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের নেই। রেমিট্যান্স প্রবাহও ১৮ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং চলতি অর্থবছরে দেশে ৩৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বর্তমান স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি হারে কিছু ব্যাংক অতিরিক্ত তারল্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিতে বেশি আগ্রহী হচ্ছে। এতে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারের গতিশীলতা কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নীতি সুদহার করিডোরের নিম্নসীমা-স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭.৫০ শতাংশে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। নীতি সুদহার করিডোরের ঊর্ধ্বসীমা-স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি ১১.৫০ শতাংশ এবং ওভার নাইট রেপো নীতি সুদহার ১০ শতাংশ অপরিবর্তিত থাকবে। নতুন সিদ্ধান্ত আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।
গভর্নর আরও মন্তব্য করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন না দেওয়ায় ব্যাংক লুটপাটের ঝুঁকি থেকে যায়।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এটি করা দরকার ছিল, কিন্তু হয়নি। পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের কাছে প্রস্তাব রেখে যাব। এটি করা হলে ব্যাংকিং খাতে নতুন সময়ের সূচনা হতো এবং তা অব্যাহত রাখা যেত।
তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গভর্নর হিসেবে কাজ করার সময় কোনো চাপ বা অপারেশনে সমস্যা হয়নি, তবে ব্যাংক কোম্পানি অর্ডিন্যান্সসহ তিনটি আইন করা সম্ভব হয়নি। এগুলো হলে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হতো। একই সঙ্গে বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বেহাত সম্পদ পুনরুদ্ধারে কাজ শুরু হয়েছে। এজন্য ১২টি আইন সংক্রান্ত ফার্ম নিয়োগ করা হয়েছে, যা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে এবং ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে। আইন পাশ হলে মামলার ব্যবস্থা করা হবে।
গভর্নর জানিয়েছেন, জানুয়ারি-জুন সময়ের মুদ্রানীতিতে মূলত সব সূচক সফলভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে, কেবল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে। সামনের দিনগুলোতে অর্থনীতি আরও ভালো করবে এবং মূল্যস্ফীতিও কমবে আশাবাদী তিনি।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








