ব্রাজিলের আইকনিক ১০ নম্বর জার্সি কার, নেইমার নাকি ভিনিসিয়ুস?
ছবি: সংগৃহীত
আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপ মাঠে গড়ানোর আগেই মাঠের বাইরের এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত দ্বন্দ্বে উত্তাল হয়ে উঠেছে সেলেসাও শিবির। ব্রাজিল ফুটবলের সবচেয়ে বড় আবেগ, ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের প্রতীক ‘১০ নম্বর’ জার্সিটি আগামী বিশ্বকাপে আসলে কার গায়ে উঠবে—তা নিয়েই এখন বিশ্বজুড়ে চলছে তুমুল বিতর্ক ও চুলচেরা বিশ্লেষণ।
সম্প্রতি কিছু আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ব্রাজিলের ফুটবলের পোস্টার বয় হিসেবে পরিচিত নেইমার জুনিয়রকে এবার তার চিরচেনা ১০ নম্বর জার্সি থেকে বঞ্চিত করা হতে পারে এবং তাকে দেওয়া হতে পারে ১৩ নম্বর জার্সি।
অন্যদিকে, ব্রাজিলের এই ঐতিহাসিক ও আইকনিক জার্সির নতুন উত্তরসূরি হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের নাম বাতাসে ভাসছে। যদিও ফুটবল ফেডারেশন বা দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো জার্সি নম্বর এখনো চূড়ান্ত বা নিশ্চিত করা হয়নি, এমনকি কিছু সূত্র এই প্রতিবেদনকে ভিত্তিহীন বলেও উড়িয়ে দিয়েছে, তবুও এই গুঞ্জন ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ভক্তদের স্পষ্ট দুটি ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। ফুটবলবোদ্ধাদের মনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন ঐতিহ্যের রাজদণ্ড কি নেইমারের কাছেই থাকবে, নাকি ভিনির হাত ধরে নতুন যুগের সূচনা হবে?
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে ‘১০ নম্বর’ জার্সিটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি এক বিশাল দায়বদ্ধতা এবং ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট। ফুটবলের কালো মানিক পেলে এই জার্সিটিকে বিশ্বজুড়ে এক রূপকথার প্রতীকে পরিণত করেছিলেন। পরবর্তীতে জিকো, রিভালদো, রোনালদিনহো এবং কাকার মতো মহাতারকারা এই জার্সির গৌরবময় ইতিহাসকে নিজেদের পায়ের জাদুতে আরও সমৃদ্ধ ও সোনালী অক্ষরে লিখে গেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের ২১ জুন প্রথমবারের মতো ব্রাজিলের ঐতিহাসিক ১০ নম্বর জার্সিটি গায়ে জড়ানোর সুযোগ পান নেইমার জুনিয়র। এরপর থেকে বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে জাতীয় দলের আক্রমণভাগের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন সান্তোসের এই প্রাক্তণ ফরোয়ার্ড। জার্সিটির সঙ্গে নেইমারের এই আত্মিক সম্পর্ক কেবল মাঠের পারফরম্যান্স, আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা কিংবা বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এক চরম বৈরী প্রজন্মে সমস্ত চাপ, প্রত্যাশা ও কিংবদন্তিদের সঙ্গে তুলনার বোঝা মাথায় নিয়ে তিনিই ছিলেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের একমাত্র ত্রাতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চোট, ফর্মহীনতা ও মাঠের বাইরের নানা সমালোচনা তার পিছু ছাড়েনি ঠিকই, তবে সেলেসাওদের ড্রেসিংরুমে তার একক প্রভাব ও সতীর্থদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা এখনো বিন্দুমাত্র কমেনি।
আরও পড়ুন: ২০২৬ বিশ্বকাপে বিদেশি কোচের আধিপত্য, শীর্ষে আর্জেন্টিনা
অন্য প্রান্তে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বর্তমানে ব্রাজিল ফুটবলের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উভয় সংকটেরই সবচেয়ে বড় সমাধান। স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে গত কয়েক মৌসুমে গতি, নিখুঁত ড্রিবলিং, অদম্য আত্মবিশ্বাস এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মতো বড় বড় ম্যাচে শিরোপাজয়ী পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নিজেকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম ভয়ংকর ও প্রভাবশালী আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ভিনি। ২০২৩ সালের ১৭ জুন নেইমার যখন গুরুতর চোটের কারণে দলের বাইরে ছিলেন, তখন প্রথমবারের মতো ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নেমেছিলেন এই তরুণ উইঙ্গার। সেই সময় থেকেই মূলত তরুণ ও আধুনিক ফুটবল ভক্তদের একাংশ ভিনিসিয়ুসকে ব্রাজিলের নতুন ফুটবল নেতা এবং নতুন প্রজন্মের সুযোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে শুরু করেছেন। গতিময় ও আধুনিক ফুটবলের দাবিতে সেলেসাওদের আক্রমণভাগের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ভিনিসিয়ুসের দাবি দিন দিন আরও জোরালো হচ্ছে, যা ১০ নম্বর জার্সির লড়াইকে এক নতুন মাত্রায় রূপ দিয়েছে।
বর্তমান হাইপ্রোফাইল কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল দল এখন এক ক্রান্তিকাল পার করছে, যেখানে তার স্কোয়াডে একই সঙ্গে রয়েছেন অভিজ্ঞতার প্রতীক নেইমার এবং ফর্মে থাকা ভিনিসিয়ুস। স্বাভাবিকভাবেই এই সিদ্ধান্তটি কোচের জন্য চরম জটিল এক মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা। দলের অভ্যন্তরীণ শ্রেণিবিন্যাস, জ্যেষ্ঠতা (সিনিয়রিটি) এবং মাঠ ও মাঠের বাইরে নেইমারের অপরিসীম প্রভাবকে যদি আনচেলত্তি সর্বোচ্চ সম্মান জানান, তবে সবচেয়ে স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত ফলাফল হবে নেইমারের ১০ নম্বর জার্সি ধরে রাখা। সে ক্ষেত্রে ভিনিসিয়ুসকে তার চেনা ৭ নম্বর জার্সিতেই ফিরে যেতে হবে, যা তিনি রিয়াল মাদ্রিদ ও জাতীয় দলে এর আগেও নিয়মিত পরেছেন। সম্প্রতি রাফিনিয়ার মতো প্রথম সারির সতীর্থরা প্রকাশ্যে গণমাধ্যমে দলের ভেতরে নেইমারের অপরিহার্য ভূমিকার প্রশংসা করেছেন, যা প্রমাণ করে দলের অভিজ্ঞতার জায়গায় নেইমারের অবস্থান এখনো কতটা সুদৃঢ়।
তাছাড়া, নেইমারের সামনে রয়েছে এক অনন্য ঐতিহাসিক কীর্তি গড়ার হাতছানি। তিনি যদি এই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামেন, তবে ফুটবল ইতিহাসে চারটি ভিন্ন ফিফা বিশ্বকাপে এই আইকনিক নম্বর ব্যবহার করা একমাত্র ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার হওয়ার গৌরব অর্জন করবেন এবং এই অনন্য রেকর্ডে তিনি ছাড়িয়ে যাবেন স্বয়ং ফুটবল সম্রাট পেলেকেও।
ফুটবল ইতিহাসের এক অদ্ভুত ও মজার বিষয় হলো, যে পেলের হাত ধরে ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সি আজ বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতীকে পরিণত হয়েছে, তার সেই গল্পটি শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ কাকতালীয়ভাবে। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে ফিফার কাছে ব্রাজিল দল তাদের খেলোয়াড়দের জার্সি নম্বর নির্দিষ্ট করে না পাঠানোয়, ফিফা কর্তৃপক্ষ নিজেদের মতো করে এলোমেলোভাবে স্কোয়াড নম্বর বন্টন করেছিল। সেখান থেকেই পেলের পিঠে জুটে যায় ১০ নম্বর, যা পরবর্তীতে ফুটবল ইতিহাসের অমর এক অধ্যায়ের জন্ম দেয়।
আজকের দিনে এসে সেই ১০ নম্বরের ঐতিহ্য রক্ষা আর নতুন প্রজন্মের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ব্রাজিল দলকে বিশ্বকাপের আগে কতটা উজ্জীবিত বা চাপে রাখবে, তা সময়ই বলে দেবে। ঐতিহাসিক সিনিয়রিটির জয় হবে নাকি নতুনদের হাতে ব্যাটন উঠবে এই বহুল চর্চিত প্রশ্নের চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক জবাব পেতে বিশ্বজুড়ে ফুটবল প্রেমীদের আরও কিছুদিন গভীর উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করতে হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








