রণাঙ্গন থেকে ফুটবল মাঠ: একাত্তরে স্বাধীন বাংলা দলের অপ্রতিরোধ্য যুদ্ধ
ছবি: সংগৃহীত
১৯৭১ সালের ১ মার্চ ঢাকা স্টেডিয়ামে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার ঘোষণা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে স্টেডিয়ামে শুরু হয়েছিল পাকিস্তানের সঙ্গে চার দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ।
১ মার্চ রেডিও পাকিস্তান জানায়, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছেন।
ঘোষণা শোনার সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়ামের সাধারণ দর্শকরা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ‘ইয়াহিয়ার ঘোষণা মানি না’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’—এ ধরনের স্লোগান ওঠে। এরপর শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ২৫ মার্চ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তান হানাদার বাহিনী হামলা চালায়। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা ঘোষণা করা হয়। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর আসে বিজয় দিবস।
- স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল: যুদ্ধের মঞ্চে খেলার শক্তি
মুক্তিযুদ্ধে ফুটবল খেলোয়াড়দের ভূমিকা ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে অনন্য। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠিত হয় ১৯৭১ সালের জুনে। এই দল ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি ও অর্থ সংগ্রহের কাজ করে।
দলের গঠন হয় বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের নির্দেশনায়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের চিঠির মাধ্যমে মুজিবনগর ক্যাম্পে খেলোয়াড়দের উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। প্রথমে ৪০ জন খেলোয়াড় যোগ দেন, পরে বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সদস্য সংখ্যা হয় ৩১।
- নেতৃত্ব ও পরিচালনা
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন জাকারিয়া পিন্টু, সহ-অধিনায়ক প্রতাপ শঙ্কর হাজরা। কোচ ও ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন ননি বসাক ও তানভীর মাজহারুল তান্না। ভারত সরকারের সহায়তায় দলটি মাঠে নামতে সক্ষম হয়। ভারতের বিভিন্ন শহরে খেলোয়াড়রা প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে।
প্রথম ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ২৫ জুলাই ১৯৭১ সালে কৃষ্ণনগর স্টেডিয়ামে। এই দিন বাংলাদেশের পতাকা ভারতের পতাকার পাশাপাশি উত্তোলন করা হয়, জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়। মাঠে উপস্থিত ছিলেন ২০–২৫ হাজার দর্শক। এই মুহূর্তটি বাঙালি জাতির জন্য গৌরবময় হিসেবে বিবেচিত।
- ফুটবল: প্রতিরোধ ও ঐক্যের শক্তিশালী মাধ্যম
প্রতাপ শঙ্কর হাজরা স্মৃতিচারণে বলেন, “ফুটবল কেবল খেলা ছিল না; এটি জাতীয় সংগ্রামের এক কার্যকর মাধ্যম। প্রথমে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গান আয়োজনের ভাবনা ছিল, কিন্তু তা সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছিল না। ফুটবলই একমাত্র প্ল্যাটফর্ম ছিল যা সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কাছে আমাদের বার্তা পৌঁছে দিতে পারত—এটি কোনো ধর্মের যুদ্ধ নয়, এটি জাতীয় সংগ্রাম।”
হাজরা ব্যক্তিগতভাবে ২৫ মার্চ তার বাড়িতে আগুন দেওয়ার স্মৃতি শেয়ার করেন।
তিনি বলেন, “এ ঘটনা আমাকে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছিল। বিজয়ের পর দেখেছি, যারা দখল করেছিল, তারা চলে গেছে।”
আরও পড়ুন: শেষমেশ পুরস্কারের ২ কোটি টাকা হাতে পেল হামজা-জামালরা
- প্রদর্শনী ম্যাচ ও জনমত তৈরি
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, বেনারস, মুম্বাইসহ বিভিন্ন শহরে ১৭টি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলেছে। খেলোয়াড়রা ধর্ম, সম্প্রদায় অতিক্রম করে একত্রিত হয়েছিলেন। শুরুতে হিন্দু-মুসলমান মিলিয়ে খেলোয়াড়দের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও পরে সমর্থন বৃদ্ধি পায়।
ম্যাচগুলো থেকে অর্জিত অর্থ মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে জমা হয়। এই কার্যক্রম বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বিরল। দলের পক্ষে প্রথম গোল করেন শাহজাহান।
- ব্যক্তিগত দিক ও ইতিহাসের শিক্ষণীয় বিষয়
প্রতাপ শঙ্কর হাজরা বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ কোনও ধর্মের বিরুদ্ধে ছিল না। এটি নিপীড়ন, বৈষম্য ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ছিল। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল সেটাই প্রমাণ করেছে—এক পতাকার নিচে মুসলমান ও হিন্দু একসাথে লড়েছে।”
তিনি ইতিহাস বিকৃত করার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বর্তমানের বয়ান চূড়ান্ত ইতিহাস নয়, বরং প্রমাণের ভিত্তিতে ইতিহাস আবিষ্কৃত হয়।
হাজরা ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের জন্য ৩০–৬০ লাখ টাকার অনুদান থেকেও কোনো টাকা গ্রহণ করেননি। স্বাধীন দেশে ফেরার অনুভূতি তিনি ভাষায় প্রকাশের বাইরে বলেন।
- স্বীকৃতি ও উত্তরাধিকার
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ক্রীড়া সাংবাদিকদের তথ্য অনুযায়ী মোট ১৬–১৭টি ম্যাচ খেলে। তাদের খেলাধুলার উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি ও সহায়তা প্রদান। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা স্বাধীন বাংলা দলের ফুটবলারদের ‘আরেক মুজিব বাহিনী’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
আজও তাদের অবদান প্রজন্মের জন্য গৌরবের ইতিহাস। দলটি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে কোনো পদক পায়নি, তবে তারা জাতির কাছে চিরকাল শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে স্বীকৃত।
- সদস্যদের তালিকা (সংক্ষিপ্ত)
অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়ক: জাকারিয়া পিন্টু, প্রতাপ শঙ্কর হাজরা
প্রধান খেলোয়াড়রা: আলী ইমাম, মোহাম্মদ কায়কোবাদ, অমলেশ সেন, আইনুল হক, নিহার কান্তি দাস, শেখ আশরাফ আলী, বিমল কর, শাহজাহান আলম, মনসুর আলী লালু, কাজী সালাউদ্দিন, এনায়েতুর রহমান, সুভাষ সাহা, কে এম নওশেরুজ্জামান, ফজলে সাদাইন খোকন, আবুল হাকিম, তসলিমউদ্দিন শেখ, আমিনুল ইসলাম, আবদুল মমিন জোয়ারদার, মনিরুজ্জামান পেয়ারা, সাত্তার, প্রাণ গোবিন্দ কুন্ডু, মুজিবর রহমান, মেজর জেনারেল (অব.) খন্দকার নুরুন্নবী, লুৎফর রহমান, সাইদুর রহমান প্যাটেল, অনিরুদ্ধ চ্যাটার্জি, সনজিব কুমার দে, মাহমাদুর রশিদ, দেওয়ান মোহাম্মদ সিরাজউদ্দিন
মুক্তির জন্য ফুটবল খেলেছিলেন যারা, তারা ছিল স্বাধীনতার আরেকটি অস্ত্র। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল শুধু ক্রীড়াঙ্গনের নয়, জাতীয় ইতিহাসেরও এক অনন্য অধ্যায়। তাদের প্রতি সম্মান জানিয়ে নিশ্চিত করা প্রয়োজন, এই ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছাক।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








