নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:২৬, ২৫ মে ২০২৬

ঈদের আনন্দ বিষাদে রূপ দিচ্ছে মহাসড়কের অব্যবস্থাপনা ও বাড়তি ভাড়া

ঈদের আনন্দ বিষাদে রূপ দিচ্ছে মহাসড়কের অব্যবস্থাপনা ও বাড়তি ভাড়া

ফাইল ছবি

প্রতি বছরই উৎসবের আমেজ নিয়ে আসে পবিত্র ঈদুল আজহা। তবে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা সাধারণ মানুষের জন্য এই আনন্দযাত্রা বারবারই পরিণত হচ্ছে বিষাদে। আইন ও সচেতনতামূলক প্রচারণার তোয়াক্কা না করে মহাসড়কে চলছে মৃত্যুর নির্মম খেলা। এবারের ঈদযাত্রার শুরুতেই সড়ক ও রেলপথে একের পর এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ, যা দেশের সড়ক পরিবহন খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং যাত্রী নিরাপত্তার প্রতি চরম অবহেলাকে আবারও উন্মোচিত করেছে।

সোমবার (২৫ মে) থেকে কোরবানি ঈদের আনুষ্ঠানিক ছুটি শুরু হলেও, মূলত গতকাল রবিবার রাত থেকেই রাজধানী ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছে ঘরমুখো মানুষের স্রোত। প্রতি ঈদের মতো এবারও যানবাহনের চরম সংকট এবং বাস মালিকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। 

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির অভিযোগ, ঈদযাত্রাকে ঘিরে চলমান এই ভাড়া নৈরাজ্য, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহন এবং সড়ক ও নৌপথের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এখন মারাত্মক হুমকির মুখে। 

সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী সোমবার এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, বাস মালিক সমিতি অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা পুরোপুরি ভঙ্গ করা হয়েছে। ফলে মহাসড়কে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের ‘মৃত্যুর মিছিল’ শুরু হয়েছে।

বিবৃতিতে যাত্রী কল্যাণ সমিতি উল্লেখ করেছে, ঈদযাত্রায় বিভিন্ন রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বহুগুণ বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে। এই তীব্র আর্থিক চাপে পড়ে শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ বাধ্য হয়ে কম খরচে বাড়ি পৌঁছানোর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প পথ বেছে নিচ্ছেন। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদ, বাসের ছাদ, পণ্যবোঝাই ট্রাক কিংবা খোলা পিক-আপে করে গন্তব্যে রওনা হচ্ছেন। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এই খেটে খাওয়া মানুষদের নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র বারবার ব্যর্থ হচ্ছে বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। তারা জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য বন্ধ করে সাধারণ মানুষের ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে।

অতিরিক্ত ভাড়া ও গণপরিবহন সংকটের এই করুণ পরিণতি দেখা গেছে দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে। আজ সোমবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিহাতীতে একটি যাত্রীবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গভীর খাদে পড়ে গেলে ঘটনাস্থলেই ১৫ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং আহত হন আরও বেশ কয়েকজন। এর আগে চট্টগ্রাম থেকে স্বল্প ভাড়ায় রডবোঝাই ট্রাকে করে নওগাঁ যাওয়ার পথে টাঙ্গাইলের যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তে আরেকটি ট্রাক উল্টে ১৭ জন নিহত এবং ১০ জন গুরুতর আহত হন। শুধু সড়কপথই নয়, রেলপথেও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। নরসিংদীর ঘোড়াশালে ট্রেনের ছাদে চড়ে ভ্রমণের সময় বজ্রপাতে ২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। প্রতি ঈদেই এই পণ্যবাহী ট্রাক বা বিকল্প ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে বাড়ি ফিরতে গিয়ে মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে, যা কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না।

আরও পড়ুন: ঈদের পর সব আন্তঃনগর ট্রেনে নারীদের জন্য আলাদা কোচের পরিকল্পনা

অথচ এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধে দেশে কঠোর আইন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সচেতনতামূলক প্রচারণা কোনোটিরই অভাব নেই। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বাংলাদেশ পুলিশ ২০২৪ সালে একটি হৃদয়স্পর্শী ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেছিল, যেখানে দেখানো হয়েছিল কীভাবে ঈদের সময় ট্রাকে চড়ে বাড়ি ফিরতে গিয়ে একটি পরিবার মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়। এছাড়াও প্রতি ঈদেই পুলিশের পক্ষ থেকে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম এবং প্রধান সড়কগুলোতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, সাধারণ যাত্রী কিংবা পরিবহন চালক কারো মধ্যেই এই প্রচারণার কার্যকর কোনো প্রভাব বা সচেতনতা দেখা যাচ্ছে না।

আইনি কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশে কার্যকর রয়েছে ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’। 

এই আইনের ১০২ ধারা অনুযায়ী, পণ্যবাহী ট্রাকে যাত্রী পরিবহন করা একটি দণ্ডনীয় ফৌজদারি অপরাধ। এই ধারা অমান্য করলে অভিযুক্ত ব্যক্তির অনধিক ১ মাসের কারাদণ্ড, বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। 

এছাড়াও, লাইসেন্স ছাড়া বা ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালালে অনধিক ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা ৬ মাসের জেল এবং নির্ধারিত গতিসীমার চেয়ে অতিরিক্ত গতিতে বেপরোয়া গাড়ি চালালে অনধিক ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা ৩ মাসের কারাদণ্ডের নিয়ম আছে।

আইনের খাতায় কঠোর শাস্তির এই সমস্ত বিধান থাকলেও বাস্তবে মহাসড়কগুলোতে এর কোনো দৃশ্যমান প্রয়োগ নেই। ঈদ এলেই মহাসড়কের চেনা চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। অতিরিক্ত যাত্রীচাপের সুযোগ নিয়ে এবং বেশি মুনাফা লাভের আশায় পরিবহন মালিকরা সব ধরনের ফিটনেসবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন রাস্তায় নামিয়ে দেয়। অন্যদিকে পর্যাপ্ত তদারকি ও নজরদারির অভাবে পণ্যবাহী ট্রাক ও পিক-আপে যাত্রী পরিবহন এখন একটি ‘স্বাভাবিক’ নিয়মে পরিণত হয়েছে।

এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, শুধু কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আকস্মিক অভিযান চালানো কিংবা দায়সারা প্রচারণা চালিয়ে এই গভীর সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। 

তিনি পরামর্শ দেন, ঈদের অন্তত কয়েকদিন আগে থেকেই দেশের প্রতিটি মহাসড়কে নিয়মিত ও কঠোর তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করা, পর্যাপ্ত গণপরিবহনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রশাসনের ওপর দায় চাপিয়ে দিলেই হবে না, যাত্রীদের নিজেদের জীবনের মূল্য বুঝতে হবে। কয়েক ঘণ্টা আগে বাড়ি পৌঁছানোর তাড়াহুড়ো বা অল্প কিছু টাকা বাঁচানোর এই বিপজ্জনক চেষ্টা অনেক সময় একটি পুরো পরিবারের জন্য আজীবনের কান্না ও ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়ায়। তাই ঈদযাত্রায় সড়ক, রেল ও নৌপথে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই এড়িয়ে চলা, বাসের ছাদে না ওঠা এবং পণ্যবোঝাই বা খোলা ট্রাকে ভ্রমণ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার জন্য যাত্রী সাধারণের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকারি নির্দেশনা ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে প্রতি ঈদেই উৎসবের আনন্দ এভাবে বিষাদের মিছিলে হারিয়ে যাবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়