News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২১:৪৪, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫
আপডেট: ২১:৪৪, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫

রাজধানীর বাইরে চার অঞ্চলে শুটারদের তৎপরতা, নদী-ইটভাটায় গোপন প্রশিক্ষণ

রাজধানীর বাইরে চার অঞ্চলে শুটারদের তৎপরতা, নদী-ইটভাটায় গোপন প্রশিক্ষণ

ফাইল ছবি

নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। রাজধানীর বাইরে নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রধারী পেশাদার শুটারদের একাধিক গ্রুপ। 

চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও নারায়ণগঞ্জ—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন শুটার আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক গোয়েন্দা সূত্র।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ভোটের মাঠে প্রভাব বিস্তার, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো এবং প্রয়োজনে টার্গেট কিলিংয়ের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এসব শুটার গ্রুপ গভীর রাতে নদীর মাঝখানে নৌকায় বসে কিংবা পরিত্যক্ত ইটভাটায় আগ্নেয়াস্ত্র চালনার গোপন প্রশিক্ষণ চালাচ্ছে।

  • নির্বাচনী উত্তাপ বাড়তেই সুসংগঠিত হচ্ছে শুটারদের তৎপরতা

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, নির্বাচন যত কাছে আসছে, শুটারদের কার্যক্রম ততই পরিকল্পিত ও সংগঠিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আগে নিষ্ক্রিয় বা আত্মগোপনে থাকা শুটারদের নতুন করে যোগাযোগ করে মাঠে নামানো হচ্ছে। স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং অপরাধী গডফাদারদের মাধ্যমেই এই যোগাযোগ স্থাপন হচ্ছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

  • চট্টগ্রাম: কর্ণফুলীর চরাঞ্চলে গভীর রাতের ‘প্রস্তুতি’

চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর চরাঞ্চল ও পতেঙ্গা এলাকার নির্জন স্থানগুলোকে অন্তত পাঁচজন শুটারের একটি গ্রুপ নিয়মিত ব্যবহার করছে। স্থানীয় জেলেদের বরাতে জানা গেছে, গভীর রাতে নৌকার ইঞ্জিনের শব্দের সঙ্গে মাঝেমধ্যে গুলির মতো শব্দ শোনা যায়। তবে নির্বাচনী উত্তাপ ও ভয়-ভীতির কারণে কেউ প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন না।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, এই গ্রুপটি মূলত নির্বাচনের আগে ‘ভয় দেখানোর’ কাজের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

  • খুলনা: নদীতীর ও পরিত্যক্ত ইটভাটায় অস্ত্রচালনার অনুশীলন

খুলনায় রূপসা ও ভৈরব নদীসংলগ্ন এলাকা এবং পরিত্যক্ত ইটভাটাগুলো শুটারদের গোপন প্রশিক্ষণের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এখানে সক্রিয় অন্তত চারজন শুটার আগে মাদক কারবার ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ছিল। নির্বাচনের আগে তারা আবার সংগঠিত হয়ে নিয়মিত আগ্নেয়াস্ত্র চালনায় অনুশীলন করছে।

  • রাজশাহী: সীমান্তঘেঁষা এলাকায় অস্ত্রের সহজ প্রবাহ

রাজশাহীতে পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চলে অবৈধ অস্ত্রের সহজ প্রবাহ শুটারদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। পদ্মা নদীর চর, ফাঁকা কৃষিজমি ও বন্ধ ইটভাটায় গভীর রাতে গুলি চালনার অনুশীলনের তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

আরও পড়ুন: প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলার ঘটনায় গ্রেফতার ১৭, শনাক্ত ৩১

এখানে অন্তত তিন থেকে চারজন শুটার সক্রিয় রয়েছে, যারা প্রয়োজনে ঢাকাসহ দেশের অন্য জেলায় গিয়ে নির্বাচনী সহিংসতায় ব্যবহৃত হতে পারে বলে গোয়েন্দাদের আশঙ্কা।

  • নারায়ণগঞ্জ: গ্যাং কালচার ও রাজনৈতিক প্রভাবের সরাসরি সংযোগ

নারায়ণগঞ্জে শুটার নেটওয়ার্কের সঙ্গে গ্যাং কালচার ও রাজনৈতিক প্রভাবের সরাসরি সংযোগের তথ্য মিলেছে। শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী এলাকা ও বন্ধ ইটভাটাগুলোতে নিয়মিত প্রশিক্ষণের তথ্য রয়েছে পুলিশের হাতে।

এখানকার শুটারদের অনেকেই একাধিক মামলার আসামি হলেও জামিনে মুক্ত থেকে আত্মগোপনে রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

  • নির্দিষ্ট লক্ষ্যেই চলছে প্রশিক্ষণ

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শুটারদের এই প্রশিক্ষণ কোনো বিচ্ছিন্ন বা এলোমেলো কার্যক্রম নয়। নির্বাচন সামনে রেখে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্যই এই প্রস্তুতি চলছে। খুব কাছ থেকে নিখুঁত নিশানা, দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ, অস্ত্র লুকানো এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখার কৌশল—এসব বিষয়েই তারা নিয়মিত অনুশীলন করছে।

পুলিশের নজর এড়াতে নির্দিষ্ট কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র না রেখে বারবার স্থান পরিবর্তন করা হচ্ছে।

  • আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বীকারোক্তি: বড় ঝুঁকি নির্বাচনের জন্য

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, নির্বাচন এলেই পেশাদার শুটার ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ে। প্রকাশ্যে সংঘর্ষের ঝুঁকি এড়িয়ে কম সময়ে বড় প্রভাব ফেলতে শুটারদের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ভোটের সময় বন্দুকধারী শুটার মানেই বড় ঝুঁকি। তারা দৃশ্যমান না থাকলেও নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত করার সক্ষমতা রাখে।

  • তালিকা হালনাগাদ হচ্ছে, তবে বাধা রাজনৈতিক চাপ

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, নির্বাচন সামনে রেখে অস্ত্রধারী ও পেশাদার অপরাধীদের হালনাগাদ তালিকা তৈরির কাজ চলছে। 

তবে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রাজনৈতিক চাপ, স্থানীয় আশ্রয়দাতা এবং জামিন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে শুটারদের বড় একটি অংশ এখনো আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

  • গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য বড় হুমকি

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুটার গ্রুপগুলোর এই সক্রিয়তা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্যও গুরুতর হুমকি। 

তাদের মতে, শুটারদের ধরপাকড়ের পাশাপাশি অর্থদাতা, আশ্রয়দাতা ও রাজনৈতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করা গেলে নির্বাচনী সহিংসতার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, চার বিভাগের শুটার গ্রুপগুলোর এই নীরব কিন্তু সুসংগঠিত প্রস্তুতি দেশের নির্বাচন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামনে ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়