সকালেই ভোটযুদ্ধ শুরু, ২৯৯ আসনে একযোগে নির্বাচন ও গণভোট
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ ১৭ বছর পর এক ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক আবহে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই সাথে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সংবিধানের মৌলিক সংস্কার প্রশ্নে অনুষ্ঠিত হচ্ছে গণভোট।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে, যা বিরতিহীনভাবে চলবে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশে এক নজিরবিহীন উৎসবমুখর পরিবেশ ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা লক্ষ্য করা গেছে।
নির্ধারিত সময়ের আগেই বহু কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি দেখা যায়; অনেকেই ফজরের নামাজ শেষে কেন্দ্রে এসে লাইনে দাঁড়ান। নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সী ভোটারদের উৎসবমুখর অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে আজ ২৯৯টিতে ভোট হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর এক প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন বাতিল করা হয়েছে; ওই আসনের ১২৮টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে না এবং পরে নতুন তফসিল ঘোষণা করা হবে। ফলে প্রায় চার লাখ ১৩ হাজার ৩৩৭ জন ভোটার এবার ভোট দিতে পারছেন না।
এবার প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং ব্যালটও একযোগে গণনা করা হবে। সংবিধানের কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তনের প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে মতামত দিচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ গণভোটের ফল দেশের রাজনৈতিক কাঠামো ও শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আয়োজিত এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশবাসীর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেরও ব্যাপক নজর রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৩২ জন। শেরপুর-৩ বাদ দিলে প্রায় ১২ কোটি ৭২ লাখ ৯৮ হাজার ৪৫৬ জন ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন।
নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে এবার অংশ নিচ্ছে ৫০টি দল; ১০টি দল কোনো প্রার্থী দেয়নি। মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ২ হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র ২৭৩ জন। নারী প্রার্থী ৮৩ জন (দলীয় ৬৩ ও স্বতন্ত্র ২০)। বিএনপির নারী প্রার্থী ১০ জন হলেও জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য ইসলামপন্থী দলগুলোর কোনো নারী প্রার্থী নেই। বিএনপি ধানের শীষ প্রতীকে ২৯০টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে; বাকি নয়টি আসনে জোটের প্রার্থীরা নিজস্ব প্রতীকে লড়ছেন। জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক রয়েছে ২২৮টি আসনে; সাতটি আসনে প্রতীক প্রত্যাহারের আবেদন সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় বহাল থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি ২৯১ জন।
সারা দেশে প্রায় ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হচ্ছে; এর মধ্যে সাধারণ কেন্দ্র ২১ হাজার ২৭৩ এবং গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ২১ হাজার ৫০৬টি। মোট ভোটকক্ষ রয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি। সর্বনিম্ন ভোটার ঝালকাঠি-১ আসনে ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন এবং সর্বোচ্চ গাজীপুর-২ আসনে ৮ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন। ঢাকা-১২ আসনে সর্বাধিক ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, আর পিরোজপুর-১ আসনে মাত্র ২ জন।
আরও পড়ুন: সবাইকে নির্বাচনে জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার আহ্বান সিইসির
নির্বাচনী দায়িত্বে রয়েছেন ৬৯ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ৫৯৮ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা। প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং কর্মকর্তাসহ প্রায় ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন দায়িত্ব পালন করছেন। পোস্টাল ভোটের দায়িত্বে আছেন প্রায় ১৫ হাজার কর্মকর্তা। নির্বাচনী অপরাধ আমলে নেওয়া ও সংক্ষিপ্ত বিচার নিশ্চিত করতে ৬৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট এবং প্রায় ২ হাজার ১০০ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে রয়েছেন; তারা ভোটের আগে ও পরে মিলিয়ে পাঁচ দিন দায়িত্ব পালন করবেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রায় ৯ লাখ থেকে ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ হাজার, নৌবাহিনীর প্রায় ৫ হাজার, বিমানবাহিনীর সাড়ে ৩ হাজার, পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, র্যাবের ৯ হাজার ৩৪৯, বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্টগার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ এবং বিএনসিসির ১ হাজার ৯২২ সদস্য রয়েছেন। সহায়তায় ১৩ হাজার ৩৯০ জন ফায়ার সার্ভিস সদস্যও নিয়োজিত। নিরাপত্তায় প্রথমবারের মতো ড্রোন, ইউএভি ও বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে; পাশাপাশি হেলিকপ্টার ও সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি চলছে। তফসিল ঘোষণার পর সারা দেশে ৮৫০টির বেশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক রয়েছেন বিপুল সংখ্যায়। ৮১টি দেশি সংস্থার মোট ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন এর মধ্যে ৭ হাজার ৯৯৭ জন কেন্দ্রীয়ভাবে এবং ৪৭ হাজার ৪৫৭ জন স্থানীয়ভাবে কাজ করছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে প্রায় ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক বাংলাদেশে এসেছেন; তাদের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২২৩ জন, এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস থেকে ২৮ জন, কমনওয়েলথের ২৫ জন এবং ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের ১২ জন রয়েছেন। ভুটান ও নাইজেরিয়ার প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত কোথাও বড় কোনো সমস্যা দেখা যায়নি। তিনি ভোটারদের দলবেঁধে উৎসবমুখর পরিবেশে কেন্দ্রে এসে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনও জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ভোটদানকে নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানান।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, কোনো ধরনের কারচুপি বরদাশত করা হবে না; আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক রয়েছে। কোথাও ছোটখাটো ঘটনার বাইরে বড় সমস্যা নেই বলেও জানান তিনি।
রাজধানীর বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ভোটগ্রহণ শুরুর আগেই নারী ও পুরুষ আলাদা লাইনে দাঁড়িয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কেরানীগঞ্জের মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুই ব্যক্তির কাঁধে ভর দিয়ে প্রথম ভোট দেন ৭০ বছর বয়সী মমতাজ বেগম। আবার জীবনে প্রথমবার ভোট দিতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন অনেক তরুণ ভোটার।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক, কারিগরি ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। কেন্দ্রের প্রাথমিক ফল রিটার্নিং কর্মকর্তার মাধ্যমে কমিশনে পাঠানো হবে এবং অধিকাংশ আসনের ফল মধ্যরাতের মধ্যেই পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে ভোটগ্রহণ উপলক্ষ্যে যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ১১ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত ট্যাক্সিক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ১০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে।
নির্বাচনে বিদেশে অবস্থানরত ও দেশের অভ্যন্তরে থাকা মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেছেন; এর মধ্যে গতকাল বিকেল পর্যন্ত ৫ লাখ ৩১ হাজার ২১৪ জন ভোট দিয়েছেন।
সামগ্রিকভাবে দীর্ঘ সময় পর অনুষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন আশা প্রকাশ করেছে, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশবাসী একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সাক্ষী হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








