বিক্ষোভে উত্তাল চট্টগ্রাম বন্দর, শ্রমিক তোপের মুখে নৌ উপদেষ্টা
ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ও চরম অচলাবস্থার মধ্যে আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের তীব্র বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন।
বৃহস্পতিবার (০৫ ফেব্রুয়ারি) বেলা পৌনে ১১টার দিকে বন্দর ভবনে প্রবেশের সময় কয়েক’শ শ্রমিক-কর্মচারী তার গাড়িবহর আটকে দেন এবং দীর্ঘ সময় স্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ জানান। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই উপদেষ্টা বর্তমানে বন্দর কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংকট নিরসনে জরুরি বৈঠকে বসেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন সরাসরি ঢাকা থেকে সকাল সোয়া ১০টায় চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে তাকে বহনকারী গাড়িবহর বন্দরের উদ্দেশে রওনা হয়ে পৌনে ১১টার দিকে কাস্টমস মোড়ে পৌঁছায়। গাড়ির সামনে ও পেছনে পুলিশের নিরাপত্তা যান ছিল এবং পেছনের গাড়িতে ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, যিনি বিমানবন্দর থেকেই উপদেষ্টার সঙ্গে ছিলেন।
উপদেষ্টার আগমনের খবর ছড়িয়ে পড়লে সকাল থেকেই আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীরা বন্দর ভবনের অদূরে ৪ নম্বর জেটিগেট থেকে কাস্টমস মোড়সহ আশপাশের এলাকায় জড়ো হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বন্দরের নিজস্ব নিরাপত্তারক্ষীরাও অন্যান্য দিনের তুলনায় কঠোর অবস্থান নেন।
গাড়িবহর কাস্টমস মোড়ে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে শত শত শ্রমিক-কর্মচারী স্লোগান দিতে দিতে উপদেষ্টার গাড়ি ঘিরে ফেলেন এবং প্রায় ১৫ মিনিট আটকে রাখেন। এ সময় ‘ডিপি ওয়ার্ল্ডের দালালেরা হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘গো ব্যাক অ্যাডভাইজার গো ব্যাক’, ‘মা মাটি মোহনা বিদেশিদের দেব না’ সহ নানা স্লোগান শোনা যায়। অনেককে ‘ভুয়া ভুয়া’ ও ‘দালাল দালাল’ বলেও স্লোগান দিতে দেখা যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে গাড়িগুলোকে বন্দর ভবনের ভেতরে নিয়ে যায়। তবে মূল ফটক বন্ধ করার চেষ্টা করা হলেও শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারী স্লোগান দিতে দিতে ভেতরে ঢুকে পড়েন। গাড়ি থেকে নেমে ভবনে প্রবেশের সময়ও উপদেষ্টাকে ঘিরে বিক্ষোভ চলতে থাকে। পরে পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীদের পাহারায় তাকে দ্রুত লিফটে করে ওপরের তলায় উঠতে দেখা যায়।
এক পর্যায়ে বন্দর এলাকা থেকে বের হওয়ার সময় ৪ নম্বর ফটকের বাইরে আন্দোলনকারীদের মুখোমুখি হয়ে উপদেষ্টা গাড়ি থেকে নেমে তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন।
তখন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন বলেন, ৩২ বছর ধরে বন্দরে চাকরি করছি। এ রকম চেয়ারম্যান (এস এম মনিরুজ্জামান) দেখিনি। গত দেড় বছরে তিনি আমাদের নানাভাবে হয়রানি করেছেন। দেখা করতে গেলে পারি না। আমরা চেয়ারম্যানের অপসারণ চাই।
আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে উপদেষ্টা বলেন, আপনাদের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান কথা বলব। গত দেড় বছর আপনাদের সাথে কাজ করছি। আমি আপনাদের কথা শুনব। আপনাদেরও আমার কথা শুনতে হবে।
আরও পড়ুন: ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্তে পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানালেন আসিফ নজরুল
পরে তিনি বন্দর ভবনে গিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ও সৃষ্ট অচলাবস্থা নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকা কর্মবিরতির কারণে বৃহস্পতিবারও বন্দরের সব ধরনের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বহির্নোঙর থেকে জেটিতে জাহাজ আসা-যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে; পণ্য খালাসের অপেক্ষায় থাকা জাহাজগুলো নোঙরে দাঁড়িয়ে আছে। জিসিবি, সিসিটি ও এনসিটিসহ তিনটি টার্মিনাল এবং সব জেটিতে কার্যক্রম বন্ধ। জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানো হচ্ছে না, যন্ত্রপাতির অপারেটররা কাজে যোগ দেননি, বন্দরে পণ্য পরিবহনকারী যানবাহন প্রবেশ বন্ধ রয়েছে। ইয়ার্ড থেকে কনটেইনার ও পণ্য খালাসও বন্ধ আছে। পাশাপাশি ১৯টি অফডক থেকে বন্দরে কনটেইনার পরিবহন স্থগিত রয়েছে।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করা, আন্দোলন দমাতে হয়রানি ও দমন-পীড়ন বন্ধের দাবিতে বুধবার (০৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে লাগাতার কর্মবিরতি শুরু হয়। এর আগে শনিবার (৩১ জানুয়ারি) ও রবিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করে বিএনপিপন্থি দুই সংগঠন চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল এবং চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী সাবেক সিবিএ। তৃতীয় দিন সোমবার (০২ ফেব্রুয়ারি) ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর ডাকে একই সময় কর্মসূচি পালিত হয়। তিন দিনই অধিকাংশ শ্রমিক-কর্মচারী কাজে যোগ না দেওয়ায় বন্দরের প্রায় সব কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।
এ পরিস্থিতিতে সোমবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক দাপ্তরিক আদেশে ১৫ জনকে বদলির সুপারিশ করা হয়। সহকারী সচিব মো. বেলায়েত হোসেনের সই করা আদেশে দাফতরিক প্রয়োজনে বদলিপূর্বক সংযুক্তির কথা জানানো হয়; এর মধ্যে আটজনকে পায়রা বন্দরে এবং সাতজনকে মোংলা বন্দরে পাঠানো হয়। বদলি ও হয়রানির প্রতিবাদে এবং এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতির ডাক দেওয়া হয়। ওই কর্মসূচি শেষ হওয়ার আগেই মঙ্গলবার বিকেলে বন্দর ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ঘোষণা দেয়।
প্রথম তিন দিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতির পর মঙ্গলবার থেকে আন্দোলনকারীরা লাগাতার কর্মসূচিতে যান। এর ফলে বৃহস্পতিবারও বন্দর দিয়ে কোনো কনটেইনার প্রবেশ করেনি, জাহাজীকরণ হয়নি এবং পণ্য সরবরাহ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে ফলে দেশের অন্যতম প্রধান এই সমুদ্রবন্দরে কার্যত অচলাবস্থা বিরাজ করছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








