News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১২:১১, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

সরকারের ব্যর্থতা ও নতুনদের অনভিজ্ঞতায় ভোটারদের আস্থা পুরোনো দল

সরকারের ব্যর্থতা ও নতুনদের অনভিজ্ঞতায় ভোটারদের আস্থা পুরোনো দল

ফাইল ছবি

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সেই রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। দীর্ঘ ১৫ বছরের আওয়ামী শাসনের অবসান ঘটিয়ে তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে যে ‘নতুন বাংলাদেশের’ স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সেই সমীকরণ এখন অনেকটাই জটিল। একদিকে শিক্ষার্থীদের গঠিত নতুন রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, অন্যদিকে পুরনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পুনরুত্থান সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতিতে এখন এক অস্থির ও ক্রান্তিকালীন আবহ বিরাজ করছে।

জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে ঢাকার যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে ঘটে যাওয়া একটি ভিডিও চিত্র পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ২০ জুলাই পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন ১৯ বছর বয়সী ইমাম হাসান তাইম ভূঁইয়া। 

ভিডিওতে দেখা যায়, বন্ধু রাহাত হোসেন নিজের জীবন বাজি রেখে ইমামকে টেনে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, অথচ পুলিশ তখনো অবিরাম গুলি চালিয়ে যাচ্ছিল। রাহাত নিজেও পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। 

সেই ভয়াবহ স্মৃতিচারণ করে রাহাত বলেন, আমাকে শেষ পর্যন্ত বন্ধুকে সেখানেই ফেলে আসতে হয়েছিল।" পরে হাসপাতালে ইমামকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো এই দমন-পীড়নে প্রায় ১,৪০০ মানুষ প্রাণ হারান। এই সীমাহীন নৃশংসতাই শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থী-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভকে একটি অপ্রতিরোধ্য গণআন্দোলনে রূপ দেয়, যার ফলে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন।

অভ্যুত্থানের পর শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল নেতারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসেন। তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়বিচারভিত্তিক এক নতুন বাংলাদেশের। কিন্তু নির্বাচনের প্রাক্কালে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীদের নবগঠিত দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) সাংগঠনিকভাবে কিছুটা বিভক্ত এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি।

এনসিপি-র নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ স্বীকার করেছেন যে, গত পাঁচ দশকের দ্বিদলীয় শাসনের বৃত্ত ভাঙা অত্যন্ত কঠিন। সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে তারা শেষ পর্যন্ত বিতর্কিত ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীর সাথে একটি কৌশলগত জোট গঠন করেছে। যদিও আসিফ মাহমুদের দাবি, এটি কোনো আদর্শিক নয়, বরং নির্বাচনী প্রয়োজনের জোট।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে কোণঠাসা থাকা জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে আওয়ামী লীগ বিহীন রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ দলটির অতীত ইতিহাসকে বর্তমানের প্রেক্ষাপটে প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখছেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াত সমর্থিত প্যানেলের জয়কে অনেক বিশ্লেষক জাতীয় জনমতের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

আরও পড়ুন: সামাজিক মাধ্যমে নির্বাচনি প্রচারে ইসির কঠোর নির্দেশনা

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তৌফিক হক মনে করেন, নতুন প্রজন্ম জামায়াতকে আওয়ামী শাসনের অন্যতম ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে দেখছে এবং তারা পুরনো বিতর্কে আটকে না থেকে সামনে এগোতে চায়। দলটির বর্তমান প্রতিশ্রুতি—দুর্নীতি নির্মূল ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তরুণদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।

বিপ্লবের অগ্রভাগে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও, বর্তমান রাজনৈতিক বিন্যাসে তাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এনসিপি-জামায়াত জোটের প্রার্থী তালিকায় নারীদের নগণ্য উপস্থিতি অনেককে হতাশ করেছে। এনসিপি-র জ্যেষ্ঠ নেত্রী তাসনিম জারাসহ বেশ কয়েকজন নারী সদস্য এই ‘পুরুষতান্ত্রিক সমঝোতার’ প্রতিবাদে দলত্যাগ করেছেন। 

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী সীমা আক্তার অভিযোগ করেন, অভ্যুত্থানের পর থেকে নারী কর্মীদের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পদ্ধতিগতভাবে চরিত্রহনন ও আক্রমণ চালানো হয়েছে, যা তাদের রাজনীতি থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বর্তমানে নির্বাচনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিযোগী। ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে তারেক রহমান দেশে ফিরে একটি ‘রেইনবো নেশন’ বা বৈচিত্র্যময় জাতির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। যদিও বিএনপি রাজবংশীয় রাজনীতির অংশ হিসেবে পরিচিত, তবুও ভোটারদের একাংশ তাদের ‘মন্দের ভালো’ হিসেবে বিবেচনা করছে। দলটির সিনিয়র নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী মনে করেন, রাজনৈতিক উত্তরসূরি হওয়ার চেয়ে বর্তমানে গণতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবায়নই তাদের প্রধান লক্ষ্য।

আগামী সপ্তাহের ভোটই নির্ধারণ করবে জুলাইয়ের সেই আত্মত্যাগ বৃথা যাবে নাকি একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংস্কারের সূচনা হবে। 

যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের পাশে দাঁড়িয়ে আজও বিচারের অপেক্ষায় থাকা রাহাত হোসেনের ভাষায়, তেঁতুল গাছ থেকে কেউ আম আশা করতে পারে না; একটি নির্বাচিত সরকারই পারে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার নিশ্চিত করতে। 

রক্তঝরা সেই বিপ্লবের মাধ্যমে যে বীজ বপন করা হয়েছিল, তার ফল কতটা সুমিষ্ট হবে, তা এখন কোটি কোটি ভোটারের রায়ের ওপর নির্ভর করছে।

সূত্র: বিবিসি

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়